প্রাণের উৎসব হালদায়

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০

সারোয়ার সুমন ও মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম

প্রকৃতিতে প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে করোনা। নদীতে নেই দূষণ, নেই পাড় দখলের উৎসব। অনুকূল পরিবেশ পেয়ে এবার হালদায় ডিম দিতে দলে দলে এসেছে মা মাছ। ঘূর্ণিঝড় আম্পান হানা দেওয়ার পরও এ বছর ডিম সংগ্রহে হালদা পাড়ের জেলেরা ভেঙেছেন অতীতের সব রেকর্ড।

২৮০টি নৌকায় প্রায় ৭০০ জেলে চলতি বছর সংগ্রহ করেছেন ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম। গত ১২ বছরে কখনো এত ডিম আহরণ করতে পারেননি জেলেরা। গত বছর সংগৃহীত ডিমের পরিমাণ ছিল মাত্র সাত হাজার কেজি। সংগৃহীত এসব ডিম রেণুতে পরিণত করতে উৎসবমুখর কর্মযজ্ঞে মেতে উঠেছেন হালদার জেলেরা।

হালদাই দেশের একমাত্র নদী যেখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ মাছ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে ডিম ছাড়ে। কেবল এই নদী থেকেই নিষিক্ত সেই ডিম সরাসরি সংগ্রহ করতে পারেন জেলেরা। নদীর পাড়ে থাকা ছোট ছোট কুয়ায় পুরোপুরি প্রাকৃতিক উপায়েই সেইসব ডিম থেকে ফুটানো হয় রেণু। রুই-কাতলা-মৃগেলের সেই রেণু এরপর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

হালদার অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নদী গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, 'হালদা নদীর ডিম বা মাছের রয়েছে স্বতস্ত্র বৈশিষ্ট্য। মিঠাপানির বিভিন্ন উৎসে পাওয়া মাছ এক বছরে যত বড় হয়, হালদা নদীর মাছ একই সময়ে বাড়ে তিন গুণেরও বেশি। বড় হওয়ার অনুকূল পরিবেশ পেলে হালদা নদীর কাতলা মাছ হয় ২৫ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত। এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।'

চলতি বছর রেকর্ড পরিমাণ ডিম পাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে হাটহাজারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, 'হালদা নদী দূষণে দায়ী বড় দুটি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত ১৮ মাসে ১০৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে দুই লাখ ২১ হাজার মিটার ঘেরা জাল জব্দ করেছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে নৌকা বানিয়ে নদী পাহারা দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে এবার সুফল পেয়েছে জেলেরা।'

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, রেণু সংগ্রহে আসা ক্রেতাদের আসা-যাওয়ার সুবিধার্থে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হচ্ছে। আর রেণু সংগ্রহকারী, ক্রেতাসহ সংশ্নিষ্ট সবার জন্য হালদা কার্ড করা হয়েছে। এই কার্ড থাকলে করোনার মধ্যেও তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় রেণু নিয়ে যাতায়াত করতে পারবেন।

বজ্রবৃষ্টির সঙ্গে পূর্ণিমা বা অমাবস্যার জোয়ার একাকার হলে হালদা নদীতে ডিম ছাড়তে শুরু করে মা মাছেরা। এবার গত বৃহস্পতিবার সকালে আসে এমন অনুকূল পরিবেশ। টানা প্রায় সাত ঘণ্টা ডিম সংগ্রহ করেছেন জেলেরা। এত দীর্ঘ সময় ধরে ডিম সংগ্রহের সুযোগ আগে কখনও হয়নি তাদের। নদীতে জোয়ারের সময় ডিম ছাড়তে আসে মা মাছেরা। আর জেলেরা ডিম সংগ্রহ করেন ভাটার সময়। এবার রাউজানের কাগতিয়া আজিমের ঘাট, খলিফার ঘোনা, পশ্চিম গহিরা অংকুরী ঘোনা, পশ্চিম বিনাজুরী, কাগতিয়া, সোনাইর মুখ, আবুর খীল, খলিফার ঘোনা, সর্কদা, দক্ষিণ গহিরা, মেবারক খীল, মগদাই, মদুনাঘাট, উরকিরচর এবং হাটহাজারীর গড়দুয়ারা, নাপিতের ঘাট, সিপাহীর ঘাট, আমতুয়া, মাদার্শাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে জেলেরা ডিম সংগ্রহ করছেন।

এক যুগ ধরে হালদায় ডিম সংগ্রহ করছেন হরি জলদাশ। তিনি জানান, হালদায় মা মাছের ডিম সংগ্রহ করার জন্য জেলেরা মশারির নেট দিয়ে বানানো বিশেষ জাল ব্যবহার করেন। এ জাল দিয়ে টেনে তোলা ডিম এনে রাখেন নৌকার খোলের মধ্যাংশে তক্তা ও মাটি দিয়ে তৈরি করা কৃত্রিম পুকুরে। কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা ডিমগুলোকে পরে নেওয়া হয় নদী তীরবর্তী অগভীর কুয়াতে। সেখানে ডিম থেকে রেণু ফোটানো হয়।