তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা

সাক্ষীর অভাবে শেষ হচ্ছে না বিচার

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে বোমা হামলা মামলার বিচারকাজ প্রায় এক বছর আটকে আছে। সাক্ষী না আসায় বিচারকাজ শেষ করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে চার বছর আগের মামলাটি এখনও ঝুলছে। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও তারা আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিত করার দায়িত্ব পুলিশের।

ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে এ মামলার বিচারকাজ চলছে। গতকাল সোমবার মামলাটির দিন ধার্য ছিল। সাক্ষী হাজির করতে না পারায় ২৪ সেপ্টেম্বর পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন ভারপ্রাপ্ত বিচারক মনির কামাল। একই সঙ্গে মামলার শিশু আসামি জাহিদ হাসান রানার বিরুদ্ধে পৃথক চার্জশিট দাখিলের জন্য একই দিন ধার্য করা হয়। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক শফি উদ্দিনের ১৫ দিনের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন। সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবরের পর বেশ কয়েকটি নির্ধারিত শুনানির দিন ধার্য থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ কোনো সাক্ষী হাজির করতে পারেনি।

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু গতকাল সমকালকে বলেন, পুরান ঢাকার হোসেনী দালানের তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা মামলার সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না। আদালতে সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও তারা আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না। সময়মতো না এলে একপর্যায়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করে রায় ঘোষণা করতে পারেন আদালত।

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ জানান, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষী উপস্থিত না করায় মামলাটির সাক্ষ্য হচ্ছে না। রাষ্ট্রপক্ষের উচিত সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিত করানো।

সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ৪৬ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ সাক্ষ্য গ্রহণ হয় গত বছরের ২২ অক্টোবর। তিনি বলেন, ওই দিন বোমা হামলায় নিহত একজনের সহোদর আবু সাইদ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। এরপর চারটি ধার্য তারিখে কোনো সাক্ষী আসেননি। তাদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।

২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর রাতে তাজিয়া মিছিলের জন্য প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিল। পরপর তিনটি গ্রেনেড হামলা হয় সেখানে। এতে শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাজ্জাদ হোসেন নামের কিশোর ও জামাল উদ্দিন নামের একজন মারা যান।

হামলার দু'দিন পর অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে চকবাজার থানার এসআই জালাল উদ্দিন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেন। মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শফি উদ্দিন শেখ।

পরের বছর ১৮ অক্টোবর নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের ১০ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরই মধ্যে আসামিদের গ্রেফতারও করে পুলিশ। ওই অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি মারা যায়।

২০১৭ সালের ৩১ মে মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা গ্রেফতার ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। গত বছরের ১৪ মে মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। এই আদালতে সর্বশেষ সাক্ষ্য দেন আবু সাঈদ।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ১০ আসামির মধ্যে চারজন জামিন পেয়েছে। তারা হলো নেত্রকোনার কলমাকান্দার লেংগুড়া মধ্যপাড়ার ওমর ফারুক মানিক, একই উপজেলার হাফেজ আহসান উল্লাহ মাসুদ, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বড়ইতলী গ্রামের শাহজালাল মিয়া ও গাইবান্ধার সাঘাটার ডিমলা পদুম শহরের চান মিয়া। কারাগারে আছে সাঘাটার কচুয়া দক্ষিণপাড়ার কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিক, বগুড়ার আদমদীঘির কেশরতা গ্রামের মাসুদ রানা মাসুদ ওরফে সুমন, রুবেল ইসলাম ওরফে সজীব, দিনাজপুর কোতোয়ালির ঘাসিপাড়ার আবু সাঈদ রাসেল ওরফে সোলায়মান ওরফে সালমান ওরফে সায়মন, রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের পশ্চিম ইব্রাহিমনগর বালুরমাঠ এলাকার আরমান ওরফে মনির, কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুরের জাহিদ হাসান ওরফে রানা ওরফে মুসায়াব ও দিনাজপুরের রুবেল ইসলাম ওরফে সজীব ওরফে সুমন। তাদের মধ্যে জাহিদ, আরমান, রুবেল ও কবির আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।