খালেদা জিয়ার পরিবারের নামে খাস জমির মামলা

আপিল দ্রুত শুনানির আবেদন রাষ্ট্রপক্ষের

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পরিবারের নামে বন্দোবস্তের মাধ্যমে বরাদ্দ হওয়া দিনাজপুরের মাতাসাগরের প্রায় ৪৬ একর জমি-সংক্রান্ত মামলায় আপিল দ্রুত শুনানির আবেদন জানিয়েছেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক। গতকাল রোববার হাইকোর্টের সংশ্নিষ্ট শাখায় জেলা প্রশাসকের পক্ষে সরকারি কমিশনার (ভূমি) আরিফুল ইসলাম এ আবেদন দাখিল করেন।

পরে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী বশির আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, এটা সরকারের সম্পত্তি। সাবেক আইন সচিব (আবু সালেহ শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হক) দিনাজপুরের যুগ্ম জেলা জজের দায়িত্ব পালনকালে অতিদ্রুত সময়ে রায় দিয়ে ওই ৪৬ একর জমি তাদের দখলে হস্তান্তর করেন। পরে ২০০৪ সালে এই সম্পত্তি নিয়ে মামলা হয় এবং ২০০৫ সালে রায় হয়। খুব কম সময়ের মধ্যে আদালতের রায় ঘোষণাটি ছিল অনভিপ্রেত। রায়ের পর হাইকোর্টে আপিল হলে মামলার এক্সিবিট (প্রদর্শিত নথিপত্র) নিয়ে যাওয়া হয়, যার কারণে মামলাটি প্রস্তুত করা যাচ্ছে না। আপিলটি দ্রুত শুনানি করার  জন্য দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানকার এসিল্যান্ড আদালতে এসে আবেদনটি এফিডেভিট করেছেন। আবেদনে ১০ বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা এ মামলাটির আপিল শুনানির জন্য উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

নথি থেকে জানা যায়, মাতাসাগর দীঘি দিনাজপুরের মহারাজার সম্পত্তি। পরে জমিটি সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। দীঘিটি এলএ কেস নম্বর ১৬/২-৭৬-৭৭ মূলে অধিগ্রহণ করা হয়। ৪৫ দশমিক ৯৪ একর আয়তনের খাস জমি ১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে খালেদা জিয়ার বাবা এম ই মজুমদারের মালিকানাধীন দিনাজপুর লাইভস্টক অ্যান্ড পোলট্রি ফার্মের নামে বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর এক সপ্তাহের মধ্যে ১৯৮১ সালের ৪ জুন খালেদা জিয়ার বাবা তার নামে সম্পত্তিটি বন্দোবস্তের আদেশ পান। এরপর খালেদা জিয়ার বাবা ওই ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তার মা তৈয়বা মজুমদার পরিচালক হিসেবে ভোগদখল করতে থাকেন।

এম ই মজুমদার ১৯৮৪ সালে মারা গেলে ওয়ারিশ হিসেবে ছেলে সাঈদ এস্কান্দার, শামীম এস্কান্দার, মেয়ে খুরশীদ জাহান হক, খালেদা জিয়া ও শালিনা ইসলামকে রেখে যান। তারা পরে তাদের ব্যবসায়িক শেয়ার মা তৈয়বা মজুমদারের কাছে বিক্রি করেন।

তৈয়বা মজুমদার বার্ধক্যজনিত ও অসুস্থতার কারণে দিনাজপুর লাইভস্টক অ্যান্ড পোলট্রি ফার্মের সম্পূর্ণ শেয়ার ১৯৮৬ সালের ২৮ জুলাই বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত ফজলুর রহমান পটল, তার বাবা আরশাদ আলম ও রোকসানা হোসেনের কাছে বিক্রি করেন।

পরে আরশাদ আলম ওই ফার্মের পরিচালক থাকাকালে ছেলে ফজলুর রহমান পরিচালক ও চেয়ারম্যান, আরেক ছেলে মিজানুর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং রোকসানা হোসেন ফার্মের পরিচালক থাকা অবস্থায় রেজিস্ট্রার জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে রেজিস্ট্রেশন করে ফার্মের নামে জমি খারিজ করেন। আরশাদ আলম মারা গেলে তার অন্য ওয়ারিশ ও রোকসানা হোসেন তাদের শেয়ার বিক্রি করে দেন মিজানুর রহমান ও ফজলুর রহমানের কাছে। ফলে ওই ফার্মের মালিকানা নিয়ে মিজানুর রহমান ও ফজলুর রহমান সেখানে ভোগদখল করতে থাকেন। ২০০৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ওই সম্পত্তির খাজনা প্রদান করতে গিয়ে জানতে পারেন, সম্পত্তিটি ওই দু'জনের নামে না হয়ে সরকারের নামে রেকর্ড হয়েছে।

এরপর মিজানুর রহমান ও ফজলুর রহমান তাদের নিজেদের নামে ওই জমির স্বত্ব ঘোষণার আবেদন জানিয়ে দিনাজপুরের যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ডিক্রি মামলা করেন। দিনাজপুরের তৎকালীন প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল রায় দিয়ে জমিটি তাদের দখলে দেন। ওই রায় নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে। সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নেওয়া জমি কীভাবে ব্যক্তির নামে স্বত্ব ঘোষণা করা হলো, সে প্রশ্ন তোলেন অনেকেই। বর্তমানে ওই জমি দেখাশোনা করছেন মিজানুর রহমান।

চার বছর পর ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু মামলায় প্রদর্শিত নথি না থাকায় প্রায় ১০ বছর আপিলটি শুনানি করা সম্ভব হয়নি। গতকাল আপিলটি দ্রুত শুনানির জন্য দিনাজপুরের ডিসির পক্ষে একটি আবেদন হাইকোর্টের সংশ্নিষ্ট শাখায় দাখিল করা হয়েছে।

আবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বিবাদীপক্ষ (জেলা প্রশাসক কার্যালয়) আপিলটি দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নিলেও তা সম্ভব হয়নি। কারণ, বাদীপক্ষ রায় ঘোষণার পরপরই প্রদর্শিত নথিপত্র নিম্ন আদালত থেকে তুলে নেয়। বাদীপক্ষ একাধিক নোটিশ গ্রহণ করলেও তারা ওই নথি আর দাখিল করেননি। বাদীপক্ষ জেনেশুনেই এই আপিল নিষ্পত্তি করতে বিলম্ব করছে বলে দাবি বিবাদীপক্ষের। এ কারণে ওই প্রদর্শিত নথি ছাড়াই দ্রুত আপিলটি নিষ্পত্তির আর্জি জানিয়েছে তারা।