বড়লোক হওয়ার আশায় এসপি সেজে প্রতারণা

রিমান্ডে তথ্য দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে গেলেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধও বাড়ছে। যার শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ এই প্রযুক্তিগত অপরাধের শিকার হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে তার নামে অ্যাকাউন্ট খুলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিলেন। অভিযুক্ত আবদুল হান্নান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়েন। তাকে গ্রেফতারের পরই প্রতারণার কৌশল ও উদ্দেশ্য উন্মোচন হয়। অপকর্মের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পুলিশ তাকে আট দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। গতকাল রোববার ছিল রিমান্ডের তৃতীয় দিন। পুলিশ জানিয়েছে, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় এসপি সেজে প্রতারণা শুরু করেন হান্নান। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এ বিষয়ে নানা তথ্য দিচ্ছেন। রিমান্ড শেষ হলে তা জানানো হবে।

হান্নানের বাড়ি বরগুনার আমতলী উপজেলার দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া গ্রামে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা নাসির প্যাদা কৃষিকাজ করেন। বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন থেকেই প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার নামে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণা করার পরিকল্পনা করেন। পরে এসপি মাশরুকুরের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে তার ছবি প্রোফাইল ও কভারে ব্যবহার করেন। এরপর সেই আইডি থেকে এসপির দৈনন্দিন নানা কার্যক্রমের ছবি আপলোড করতে থাকেন। এভাবে কিশোরগঞ্জের এসপি হিসেবে নিজেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিত করান হান্নান। বন্ধু হিসেবে যুক্ত করেন রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ ধনী ব্যক্তিদের। বিশেষ করে ধনী মেয়েরা ছিল তার প্রধান টার্গেট। নিজেকে অধরা রাখতে কিশোরগঞ্জের কোনো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করতেন না। এভাবেই প্রতারণা আর অপকর্মের ফাঁদ পাতেন হান্নান। গলার স্বর বদলে বন্ধু তালিকায় থাকা ধনী মেয়েদের সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথা বলতেন। মেসেঞ্জারের  মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপনে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন তিনি। এভাবে একের পর এক আর্থিক প্রতারণা আর অপকর্মের ঘটনা ঘটান। ফেসবুকে কিশোরগঞ্জের এসপি পরিচয়ে হান্নানের এমন প্রতারণার শিকার একাধিক নারী এসপি মাশরুকুর রহমান খালেদের সরকারি নম্বরে জানানোর পর ফাঁস হয় প্রতারণার বিষয়টি।

পরে এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় জিডি করা হয়। এসপি মাশরুকুর সহায়তা চান সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ইন্টেলিজেন্স শাখায়। তারা উদ্ঘাটন করে এসপি মাশরুকুরের নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি চালানোর বিষয়টি। শনাক্ত করে আইডিটির মাধ্যমে প্রতারণাকারী যুবক হান্নানকে। পরে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের রিকুইজিশনে বরগুনা জেলা পুলিশ গত বৃহস্পতিবার রাতে বরগুনার আমতলীর বকুলনেছা সরকারি মহিলা কলেজ রোড থেকে তাকে আটক করে।

বরগুনা থেকে কিশোরগঞ্জ নিয়ে আসার পর শুক্রবার আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সোহরাব মিয়া। আদালত আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গত শনিবার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রেস ব্রিফিংয়ে হান্নানের প্রতারণার ব্যাপারে কথা বলেন এসপি মাশরুকুর রহমান খালেদ।

তিনি জানান, গত ১ জুন অথবা এরও আগে থেকে কিছু অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ব্যক্তিস্ব্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কিশোরগঞ্জ এসপির নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে আইডি খুলে কার্যক্রম চালাচ্ছিল। এতে এসপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি আপলোড করা হতো। এসপি জানান, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, রাজনীতিকসহ চারজনের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এ ঘটনায় কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রতারক আবদুল হান্নানকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারণার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।