স্থলবন্দরগুলোতে ঘুরেফিরে মুখচেনা কর্মকর্তারা

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

স্থলবন্দর এলাকায় ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগে বছরের পর বছর সেই মুখচেনা কর্মকর্তারাই থাকছেন। এ কারণে অনিয়ম, দুর্নীতি, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপকর্ম বেড়েই চলছে। তারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছেন। ঊর্ধ্বতনদের 'ম্যানেজ' করে একই স্থানে থাকাটা যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের এমন রেওয়াজের লাগাম টেনে ধরতে সরকার শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এসব কর্মকর্তা এক বছরের বেশি সময় একই স্থানে থাকতে পারবেন না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায়। দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে সভার সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্নিষ্টদের কঠোর নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচন থাকায় কতিপয় সুবিধাভোগী কর্মকর্তা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হতে দেননি। এরপর টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও আগের নিয়মেই সব কিছু চলছে। সেই চেনামুখ কর্মকর্তারা বছরের পর বছর ধরে স্থলবন্দর এলাকায় বিভিন্ন বিভাগে নিয়োজিত

থাকছেন। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার তেমন গরজ নেই বলে সংশ্নিষ্ট।

সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, একাধিক স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগে ঘুরেফিরে মুখচেনারাই থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ উঠলেও উচ্চ মহলে বিশেষ সখ্যের কারণে অন্যত্র বদলি করা সম্ভব হয় না। এর লাগাম শক্তভাবে টেনে ধরার উদ্যোগ নেয় সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নিজ উদ্যোগে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা ডাকা হয়। সভায় বলা হয়, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এতদিন কারা, কীভাবে এসব স্থানে কর্মরত থাকছেন, তার সব তথ্য-উপাত্ত পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করতে বলা হয়। সব স্থলবন্দরের চিত্র সম্বলিত গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়। কোনো কর্মকর্তা এক বছরের বেশি সময় একই স্থানে থাকতে পারবেন না বলে সিদ্ধান্ত কার্যকরের জন্য সংশ্নিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। চোরাচালান, দালালচক্র ঠেকানো, আমদানি-রফতানিকারক ও যাত্রীসাধারণ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেই নির্দেশনা ছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনসহ অন্যান্য সুযোগে সেটি শুধু কাগজে কলমেই রয়ে গেছে।

সভায় কিছু সুপারিশও করা হয়। সূত্র অনুযায়ী সুপারিশে বলা হয়, মাদক চোরাচালান, চোরাচালানে সহযোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যক্তিদের যাচাই করে অভিযোগ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি স্থলবন্দর তথা সীমান্ত এলাকায় এক বছরের বেশি সময় যারা রয়েছেন, তাদের তালিকা করে তাৎক্ষণিক বদলি করতে হবে। সীমান্ত

এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মাদকদ্রব্য উদ্ধারে অপরাধীকে ঘটনাস্থলেই সাজার ব্যবস্থা ও চোরাচালান মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, সিসি টিভি স্থাপন করে বন্দর-সংশ্নিষ্ট কর্মীদের আরও প্রশিক্ষিত করতে হবে। ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, উদ্ভিদ সংগনিরোধ, দালাল-ছিনতাইকারী চক্র, আমদানি-রফতানিকারক, শ্রমিক সংগঠন, স্থানীয় প্রভাবশালী অসাধু, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বন্দরে সার্বিক বিষয়ে নজরদারি বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে বন্দর-সংশ্নিষ্ট সব সংস্থার সৎ ও দায়িত্বশীল সদস্যদের সমন্বয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্থলবন্দরে যৌথ মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। স্থলবন্দরে তালিকাভুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রকৃত লাইসেন্সধারী যাত্রী যাতে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, উদ্ভিদ সংগনিরোধ ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর দ্বারা কোনো রকম হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। স্থলবন্দরগুলোতে এর আগে একই স্টেশনে একাধিকবার বা দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতে পোস্টিং না পান সে ব্যাপারে সংশ্নিষ্টদের কঠোর হতে হবে। সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের অবকাঠামোগত সমস্যার উন্নয়ন করতে হবে।

জানা যায়, বিদেশ থেকে ফল, শাকসবজি এলেও স্থলবন্দরে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না। সংগনিরোধ বিভাগে অসাধু কর্মকর্তারা অর্থের বিনিময়ে যেনতেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে ছাড়পত্র দিয়ে দেন। ফলে এসব কাঁচামালে ক্ষতিকর জীবাণু থাকছে কি-না সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে, যা দেশীয় শাক-সবজির জন্য মারাত্মক হুমকি। বন্দরে কর্মরত কতিপয় অসাধু ব্যক্তি ও স্থানীয় চিহ্নিত দালালদের সহায়তায় গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক পাচার করে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা এসব কাজ করতে দ্বিধা করছে না। নিয়মিত মনিটর না করার সুবাদে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের রাশ টেনে ধরতে না পারলে সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকদ্রব্যের ছোবলে যুব সম্প্রদায় নৈতিক অবক্ষয়ের পথে যাবে।

এছাড়াও স্থলবন্দরে বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিদেশ থেকে আমদানি করা মালামালে ওজন কম দেখিয়ে আন্ডার ইনভয়েজের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব সংগ্রহে কাস্টমস বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের 'ম্যানেজ' করে তারা এসব অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে। এতে সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ইমিগ্রেশনে যাত্রী হয়রানির এন্তার অভিযোগ থাকলেও কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়েছে এমন নজির নেই। তাছাড়া অনেকেই অর্থের বিনিময়ে এসব জায়গায় পোস্টিং নিয়েছেন বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানানো হয়। এমনকি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় এসব নিয়ে আলোচনা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্নিষ্টদের অন্যত্র বদলির পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেন, বড় বড় স্থলবন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা দালালচক্র ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে যাত্রীসাধারণ এবং ব্যবসায়ীরা হয়রানি হচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে। তবে সরকার স্থলবন্দরগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাজ করতে বলা হয়েছে। যার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাকে প্রথমে সংশোধন হওয়ার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হবে। এরপর না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বন্দর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি অব্যাহত ছিল ও থাকবে।