৩৬ হাজার আবেদনকারীর আপিল শুনানি হবে

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯

আবু সালেহ রনি

মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দেশের উপজেলা পর্যায়ে যেসব ব্যক্তির আবেদন নাকচ করা হয়েছে, তাদের আপিল আবেদন নিষ্পত্তির জন্য 'আপিল কমিটি' গঠন করেছে সরকার। আগামী দুই মাসের মধ্যে ওই কমিটি আপিল আবেদনকারীদের নিজ নিজ জেলায় পুনরায় যাচাই/শুনানি গ্রহণ করবে। পরে আপিল কমিটিকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। জামুকার তথ্য অনুযায়ী, আপিলকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৬ হাজার।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের উপস্থিতিতে ৮ আগস্ট জামুকার ৬৪তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জামুকার বিভাগীয় সদস্যের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আপিল কমিটি গঠিত হবে। অপর দুই সদস্যকে অবশ্যই যুদ্ধকালীন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা হতে হবে। কমিটি আগামী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর দুই মাসে আপিল আবেদনকারীদের শুনানি গ্রহণ করবে এবং পরে জামুকায় প্রতিবেদন পাঠাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, ২০১৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ আছে। যাদের আবেদন উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি অগ্রাহ্য করেছে, তাদের অনেকেই আপিল করেছেন। এখন সেই আপিল আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য আমরা কমিটি গঠন করে দিয়েছি। আবেদনকারীদের নিজ জেলায় কমিটি তাদের শুনানি গ্রহণ করবে।

জামুকা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি সারাদেশে উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি কার্যক্রম শুরু করে। ওই কমিটি থেকে যাদের আবেদন নাকচ বা যাদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা জামুকায় আপিল করেছেন। এমন আবেদনকারীর সংখ্যা ৩৫ হাজার ৯৫৮। আড়াই বছর অপেক্ষার পর এবার তাদের সেই আপিল আবেদন নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই নিয়ে বাদপড়াদের অভিযোগের শেষ নেই। তাদের অনেকেরই দাবি, স্থানীয় উপজেলা কমান্ডারসহ যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা চাহিদামতো টাকা না পেয়ে তাদের বাদ দিয়েছেন। এ নিয়ে অনেক উপজেলার বাদপড়া ব্যক্তিরা ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। আবার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরও অনেকে বলেছেন, যাচাই-বাছাইয়ের পর এমন অনেক ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, যারা কখনও মুক্তিযুদ্ধ করেননি। অনেক এলাকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়েও হয়রানি করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীও একাধিক অনুষ্ঠানে এ অভিযোগ পেয়েছেন বলে জানান।

বাদপড়াদের একজন মুজিবনগর সরকারের প্রয়াত কর্মচারী দক্ষিণা রঞ্জন রায়। মৃত্যুর আগে ২০১৪ সালের ৭ মে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি গ্রহণে বিধি অনুসারে অনলাইনে আবেদন করেন। ওই আবেদনে মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে ১৯৭১ সালে গ্রহণ করা তার বেতন-ভাতার রসিদ এবং একাত্তরের ১৭ সেপ্টেম্বর মাগুরার তৎকালীন এমএনএ আছাদুজ্জামানের দেওয়া প্রত্যয়নপত্রও দাখিল করা হয়। অথচ ঝিনাইদহ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'দক্ষিণা রঞ্জন রায় মুক্তিযোদ্ধা নন।' পরে এর বিরুদ্ধে জামুকায় আপিল করে তার

পরিবার। এ বিষয়ে দক্ষিণা রঞ্জন রায়ের ছোট ছেলে শ্যামল রায় বলেন, 'আর্থিক সুবিধা না দেওয়ার কারণেই উপজেলা কমিটি তার বাবার নাম মুক্তিযোদ্ধার চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। অথচ বাবার চাকরি-সংক্রান্ত সার্ভিস বুকের সর্বস্তরেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে।'

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির জন্য ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে এক লাখ ২৩ হাজার ১৫৪টি এবং সরাসরি ১০ হাজার ৯০০টি আবেদন জমা নেওয়া হয়। পাশাপাশি উপজেলা বা জেলার নাম উল্লেখ করা হয়নি- এমন আবেদনও পাওয়া যায় পাঁচ হাজার ৫৫৩টি। তাদের সবাইকে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ডাকা হয়েছিল। এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ নেওয়ার অভিযোগ ওঠা ৪৫ হাজার সনদ ও গেজেটধারী এবং ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে, তাদেরও যাচাই-বাছাইয়ে অংশ নিতে বলা হয়। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, এ সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তাদের মধ্যে যাদের আবেদন অগ্রাহ্য করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই জামুকায় আপিল করেছেন। বর্তমানে তালিকাভুক্ত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩৪ হাজার ৪৭৯। এর মধ্যে এক লাখ ৮৮ হাজার ১২৭ জন ভাতা ভোগ করে থাকেন।