শেষ সম্বল খুঁজছেন ক্ষতিগ্রস্তরা

ঝিলপাড় বস্তি পুড়ে ছাই

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২১ আগস্ট ২০১৯      

বকুল আহমেদ

অগ্নিকাণ্ডের পঞ্চম দিনেও অবশিষ্ট কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় ছাইয়ের মধ্যে হাতড়াচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী। লোহালক্কড় আর পোড়া টিন ছাড়া কিছুই মিলছে না তাদের ভাগ্যে। চেহারায় হতাশার ছাপ। কেউ কেউ গুমরে কাঁদছেন। আসবাবপত্র পুড়ে অবশিষ্ট থাকা ছোট ছোট লোহা, তার ও রডের টুকরো খুঁজে পেয়ে জড়ো করে রাখছেন পাশে। গতকাল রাজধানীর রূপনগরে আগুনে পোড়া ঝিলপাড় বস্তি ঘুরে এসব দৃশ্য চোখে পড়ে।

ঝিলপাড় বস্তি আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয় গত শুক্রবার রাতে। এতে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তরা স্থানীয় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে আগুনে পোড়া বস্তির জমি বেদখল হয়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কেউ খোলা আকাশের নিচে সেখানেই বসবাস করছেন পরিবার নিয়ে। বাঁশের খুঁটিতে কিংবা পোড়া ভাঙা দেয়ালের ওপর অর্ধপোড়া টিনের ছাউনি করে রয়েছেন কেউ কেউ।

গতকাল দুপুর ১২টায় রূপনগরের বঙ্গবন্ধু বিদ্যানিকেতের পেছনের সরু গলি দিয়ে বস্তিতে ঢুকেই দেখা গেল অগ্নিকাণ্ডের পঞ্চম দিনেও অবশিষ্ট কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় ছাইয়ের মধ্যে হাতড়াচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত এক বৃদ্ধ। তার নাম আলী আকবর। বয়স ৬৮ বছর। মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে পেঁয়াজ-আলুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তিনি। জানালেন, অন্তত ৩০ বছর তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এই বস্তিতে বসবাস করছেন। বস্তিতে তার ১৫টি টিনের ঘর ছিল। পজিশন (জমি) কিনে এসব ঘর তৈরি করেছিলেন তিনি। এর

মধ্যে ১০টি ভাড়া দিয়েছিলেন এবং পাঁচটিতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন। আগুনে তার সব ঘর পুড়ে ছাই হয়েছে। কিছু পোড়া টিন উদ্ধার করতে পেরেছেন। আসবাবপত্র পুরোটায় পুড়েছে আগুনে। তার দখলে থাকা ১৫টি ঘর তৈরির জমি বেদখল হওয়ার আশঙ্কায় তিনি খুঁটি দিয়ে টিনের ছাউনি দিয়ে বসবাস করছেন এখন। তিনি বলেন, 'আগুন সব শেষ করে দিয়েছে। এখন জমিটুকু নিজের দখলে রাখতে চাই। সরে গেলে যদি বেদখল হয়ে যায় সেজন্য এখানেই থাকছি টিনের নিচে।'

পাশেই দেখা গেল টিনের খুপড়ির মধ্যে এক নারী বসে কাঁদছেন। জানা গেল তার নাম ময়না। বয়স ৪০ বছর। তিনি জানালেন, বিয়ের পর ২৩ বছর স্বামীর সঙ্গে এই বস্তিতে বসবাস করছেন তিনি। নিজেরাই ঘর তুলেছিলেন। স্বামী হাকিম মান্নান ফেরি করে শরবত বিক্রি করেন আর ময়না ঘরে টেইলার্সের কাজ করেন। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জনে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে ঢাকায় পড়ালেখা করাচ্ছেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তারা গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলেন, ঈদ করতে গিয়েছিলেন। আগুনের খবর পেয়ে ওই রাতেই ঢাকায় আসেন। ততক্ষণে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উপার্জনের উৎস সেলাই মেশিনটিও পুড়েছে আগুনে। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'ছেলেমেয়েকে গ্রামের বাড়ি রেখে এসেছি। এখন স্বামী-স্ত্রী টিনের নিচে কোনোরকমে দিন পার করছি। ঘরসহ আসবাবপত্র সবই গেছে।'

ক্ষতিগ্রস্ত রিকশাচালক সালাউদ্দিন জানান, দুই হাজার টাকা ভাড়ায় তিনি বস্তিতে একটি ঘরে দুই শিশুসন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি বাইরে ছিলেন রিকশা নিয়ে। স্ত্রী-দুই সন্তান পরনের পোশাক ছাড়া কিছুই নিতে পারেননি। ছয় মাস ধরে ৯ হাজার ৭০০ টাকা সঞ্চয় করে একটি কৌটায় রেখেছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় সেই টাকা নিয়ে আসতে পারেননি তার স্ত্রী। গতকালও সেই টাকা খুঁজছিলেন পোড়া ঘরের নিচের কাঁদা পানিতে।

বঙ্গবন্ধু বিদ্যানিকেতনে আশ্রয় নেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে তাদের মধ্যে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় কম। কেউ পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না। একটি এনজিও বিনামূল্যে ওষুধও বিতরণ করছে সেখানে। আয়েশা খাতুন নামে এক নারী দুপুরে স্কুলে দাঁড়িয়ে সমকালকে জানান, তিনি দুই সন্তান নিয়ে বস্তিতে খোলা আকাশের নিচে থাকছেন। সকালে স্কুলে খাবার নিতে এসে না পেয়ে ফিরে যান। দুপুরে আবার আসবেন।