শ্বাসরোধের পর রূপাকে ১৫ তলা থেকে ফেলে দেয় সৎভাই

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯      

ইন্দ্রজিৎ সরকার

মতিঝিলের বহুতল বাণিজ্যিক ভবন সিটি সেন্টারের ছাদে রয়েছে একটি হেলিপ্যাড। হেলিকপ্টার ওঠানামা করার সেই স্থানটি দেখার খুব ইচ্ছা ছিল কলেজছাত্রী তানজিনা আক্তার রূপার। ওই ভবনেরই এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তার সৎভাই জোবায়ের আহমেদ। তাই ভাইয়ের কাছেই বেড়াতে যাওয়ার আবদার করেছিল রূপা। তার আবদার পূরণ করেন জোবায়ের। ভবনটি ঘুরিয়ে দেখান। একপর্যায়ে হঠাৎ করেই যেন তিনি পশু হয়ে ওঠেন। প্রথমে মুখ চেপে ধরেন বোনের, পরে গলা টিপে শ্বাসরোধ করেন। শেষে নিথর দেহটি ১৫ তলা থেকে ফেলে দেন রাস্তায়। গত ১০ আগস্ট বিকেলে ঘটে এই লোমহর্ষক ঘটনা। খবর পেয়ে মেয়েটির রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন মোল্লা সমকালকে বলেন, 'ঘটনার পরপরই সন্দেহভাজন হিসেবে জোবায়েরকে আটক করা হয়। তিনি ওই ভবনের ১৫ তলার একটি ব্যাংকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে তিনি পুলিশকে বিভ্রান্ত করেন। তার দাবি ছিল, কীভাবে রূপা পড়ে গেছে তিনি বলতে পারেন না। কারণ তখন তিনি গার্ডরুমে ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি প্রকৃত ঘটনা স্বীকার করেন। পরদিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।'

ঘটনার দিন বিকেলে যখন ১৭ বছর বয়সী রূপার লাশ উদ্ধার করা হয়, তখন কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। এক পথচারী রাস্তায় লাশ দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। তবে নিয়ম অনুযায়ী আগে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তদন্ত সূত্র জানায়, জোবায়ের সম্পর্কে ভাই হওয়ায় এবং কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় এ ঘটনাকে শুরুতে হত্যাকাণ্ড বলার কোনো কারণ ছিল না। এমনকি পরিবারের সদস্যরাও তেমন অভিযোগ করেননি। তবে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সন্দেহজনক কিছু আলামত পায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের সময় জোবায়ের অসংলগ্ন তথ্য দেন। এতে সন্দেহ ঘনীভূত হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাকে আবারও বিশেষ কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এতে কাজ হয়, জোবায়ের স্বীকার করেন হত্যার কথা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হেলিপ্যাড দেখানোর পর রূপাকে ১৫ তলায় নিয়ে যান। সেখানে ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রগুলোর (এসি) আউটডোর ইউনিট প্যাসেজে নিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন। এতে বাধা দেয় রূপা, একপর্যায়ে চিৎকার করে ওঠে। তখন বিপদের আশঙ্কায় তার মুখ চেপে ধরেন জোবায়ের। তখনও রূপার মুখ

থেকে গোঙানির মতো আওয়াজ বের হওয়ায় তার গলা টিপে ধরেন। কিছুক্ষণ পর তার নিথর দেহ লুটিয়ে পড়ে। এ সময় ভীত হয়ে পড়েন জোবায়ের। তিনি পরীক্ষা না করেই ধরে নেন রূপা মারা গেছে। এরপর ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানোর চেষ্টা চালান তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল থানার

এসআই আরিফুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় নিহত তরুণীর মা বাদী হয়ে সৎ ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আটক জোবায়েরকে সেই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে পরদিন আদালতে হাজির করা হয়। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, জোবায়ের হত্যার দায় স্বীকার করলেও এর বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি-না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মেয়েটির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যাবে। পাশাপাশি ঘটনার আগে রূপা যে খাবার খেয়েছিল, তাতে বিষাক্ত বা চেতনানাশক কিছু মেশানো ছিল কি-না

তাও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সার্বিক তদন্তে জোবায়েরের বক্তব্যের সত্যতা পেলে তাকে অভিযুক্ত করে দেওয়া হবে চার্জশিট।

খিলগাঁওয়ের দক্ষিণ গোড়ান এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকত রূপা। সে স্থানীয় আলী আহম্মেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবা প্রয়াত তাহাজ উদ্দিন।