দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি

উম্মে রাজিয়া কাজল গ্রেনেড হামলায় আহত

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯      

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ১৫ বছর আগের ঘটনা। ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার স্মৃতি মনে হলে এখনও আঁতকে উঠি। ওই ঘটনা ভুলে যাওয়ার মতো নয়। সেদিনের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার আঘাতের কারণে আজও আমি দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে

বেঁচে আছি। রাতে ঘুমাতে পারি না।

সেদিন ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ছিল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী, দুর্নীতি, হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চের সামনে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম কখন শেখ হাসিনা আসবেন। কিছু সময়ের মধ্যে তিনি এসে গেলেন, মঞ্চে উঠলেন, বক্তব্যও দিলেন। গভীর মনোযোগের সঙ্গে তার বক্তব্যে শুনছি। আপা (শেখ হাসিনা) বক্তব্যে শেষে যখন 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' বলার জন্য উদ্যত হলেন, তখনই একটা বোমার বিকট শব্দ। মুহূর্তেই আমার বাঁ পায়ের ওপর ছিটে এসে পড়ল জিনিসটা। তখন জানতাম না এটা গ্রেনেড। এ সময় বললাম, আল্লাহ তুমি আমাদের নেত্রীকে রক্ষা করো।

পরবর্তী সময়ে আমাকেসহ অন্য আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেখলাম আইভি আপা (মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী) বসে আছেন। সেখানে সাহারা আপা, মোলল্গা মোহাম্মদ আবু কাওসারসহ অনেক আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনেক লোকের ভিড়ে চিকিৎসা দিতে না পারায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারা আমাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে যান। শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। রাত ৯টার দিকে নেওয়া হয় ট্রমা সেন্টারে। সেখান থেকে ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ মেডিকেলে নেওয়া হয়। পরে শেখ হাসিনার নির্দেশে কলকাতা পিয়ারলেস হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই আমার চিকিৎসা চলে। আল্লাহর অশেষ রহমত ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সার্বিক সহায়তায় চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসি।

এখন আমি কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতাল ও সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শেই আছি।

ভয়াল ওই ঘটনার পর যে কোনো শব্দ শুনলেই ভয় লাগত। তিন বছর ক্রাচে ভর করে চলাফেরা করেছি। এখনও দিনরাত সে কী দুঃসহ যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণা নিয়েই কোনো রকম বেঁচে আছি। রাতে ঘুমাতে পারি না। ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ এই যন্ত্রণা বুঝবে না।

শরীরে এখনও প্রায় সাড়ে তিনশ'র মতো স্পিল্গন্টার আছে। প্রথম দিকে ৩৬টি স্পিল্গন্টার বের করা হয়েছিল। এরপর আর বের করা সম্ভব হয়নি। শরীরের পেছনের দিকে বেশি স্পিল্গন্টার রয়েছে। ডা. আ ফ ম রুহুল হক দুটো খুলেছিলেন। স্পিল্গন্টারগুলো শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিচরণ করে; নানা যন্ত্রণা দেয়। মনে হয় ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে এনজিওগ্রাম করিয়েছিলাম। রিপোর্টে দেখা গেছে, হার্টের ভেতর দুটো স্পিল্গন্টার চলে গেছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার অনেক নাটক করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে চার্জশিট দিয়েছে; বিচার হয়েছে। তবে যারা এই হামলার পেছনের নায়ক- খালেদা জিয়া এবং তার দলের লোকজন যারা এই জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, তাদের কিন্তু বিচার হয়নি। তাদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি আনা হোক। এ ছাড়া নিম্ন আদালতে যে বিচার হয়েছে, সেটা যেন দ্রুত কার্যকর হয়- সেই প্রত্যাশা করি।



অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, সাবেক সংসদ সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা