দুদকের জালে অর্ধশত কাস্টমস কর্মকর্তা

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯      

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ধরতে দেশের অন্যতম রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ফাঁদ পেতেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পণ্য খালাসে অবৈধ সুবিধা দেওয়া চক্রকে শনাক্ত করে একের পর এক মামলা দিচ্ছে তারা। এক দিনে ১৮ মামলা করারও নজির স্থাপন করেছে দুদক। ঘুষের টাকায় যারা অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদেরও আনা হচ্ছে আইনের আওতায়। বর্তমানে যারা কাস্টমসের দায়িত্বে আছেন, তাদের পাশাপাশি অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে হয়েছে মামলা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, 'ঘুষ-দুর্নীতিতে যারা জড়াবেন, তাদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আর পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই অবসরে যাওয়ার পরও অনেকে মামলার আসামি হয়েছেন।'

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও শুল্ক্ক ফাঁকি দিতে নানা কৌশলে সহায়তার অভিযোগে কাস্টমসের বর্তমান ও সাবেক ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। তাদের মধ্যে আছেন- চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক যুগ্ম কমিশনার জুয়েল আহমেদ, চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মাহিদুল ইসলাম ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এইচ এম হায়দার। কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। আবার পণ্য শনাক্তকরণের মিথ্যা কোড ব্যবহার করে পাইপ আমদানি ও খালাস প্রক্রিয়ায় সরকারের সাড়ে ৫২ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা (শুল্ক্কায়ন গ্রুপ-৮) জে এম আলী আহসান ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শেখ মো. হারুনুর রশিদসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। স্বর্ণ চোরাচালান ঘটনায় যোগসাজশ থাকায় কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আনিসুর রহমানকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শুল্ক্ক ফাঁকি দিতে সহায়তা করায় চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক সহকারী কমিশনার সাজেদুল হক, সাবেক চিফ অ্যাপ্রাইজার আবুল হাশেম, সাবেক প্রিভেনটিভ অফিসার বাহারুল ইসলাম ও নিলাম শাখার সাবেক সুপারিনটেনডেন্ট এ কে এম ফজলুল হকের বিরুদ্ধেও হয়েছে দুর্নীতির মামলা। আবার পণ্যের দাম কম দেখিয়ে রাজস্ব কম নিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় কারাগারে আছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের দুই রাজস্ব কর্মকর্তা পি বি ?পাল ও সাইফুর রহমান। সপ্তাহ দুয়েক আগে কাস্টমসের স্টাফ শাখায় দায়িত্বরত রাজস্ব কর্মকর্তা (প্রশাসন) নাজিম উদ্দিনের অফিসকক্ষের আলমারি তল্লাশি করে ঘুষের ছয় লাখ টাকা পায় দুদক। একই সময় রাজস্ব কর্মকর্তা আমজাদ হাজারীর স্ত্রীর নামে তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করে দুদক। এদিকে, চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক কর্মকর্তা শেখ আকরাম হোসেনের সম্পদ যাচাই-বাছাই করে তার এক কোটি ৯৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৩৭ টাকার অবৈধ সম্পদ থাকায় তাকে আট বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক উচ্চমান সহকারী রফিকুল ইসলাম পাটোয়ারী ও তার স্ত্রী শাহীন আক্তারকে ৮৮ লাখ ৯০ হাজার ৫৯৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গ্রেফতার করে দুদক। এর আগে কাস্টমস কর্মকর্তা আবদুল মমিন মজুমদার ও তার স্ত্রী

সেলিনা জামান পরস্পর যোগসাজশ করে এক কোটি ২৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ মমিন মজুমদারকে গ্রেফতারও করে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অফিস সুপারভাইজার তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী এস এম জাহাঙ্গীর আলম এবং তার স্ত্রী রাফেয়া বেগম ওরফে নাজমা হায়দার রাফিয়ার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি মামলা চলমান আছে। আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে চাকরি করা এ দম্পতির বিরুদ্ধে মোট আড়াই কোটি টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে উপার্জন করার অভিযোগ রয়েছে।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাবেক অ্যাপ্রাইজার আবুল কালাম আজাদ ও তার স্ত্রী মাসুমা আক্তারের বিরুদ্ধেও ৪৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৬৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৩২০ টাকার সমপরিমাণ সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। আবার প্রায় ৫৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং প্রায় ১৪ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অপরাধে চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রিভেনটিভ শাখার সুপারিনটেনডেন্ট মনজুরুল হক চৌধুরীর স্ত্রী আকতার জাহান লাইলীর নামে মামলা করেছে দুদক। আবার স্ত্রী, মা, বোনসহ পরিবারের ১১ জনের নামে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রাখার অভিযোগে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমীনের বিরুদ্ধে গত বছর মামলা করে দুদক। কাস্টমসে চাকরির মাত্র আড়াই বছরের মধ্যেই আল আমীন সোনালী ব্যাংকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নিজ নামে ৮০ লাখ টাকার এফডিআর, তার মা শরীফ হাসিনা আজিম ও বোন শরীফা খানমের নামে ৭৫ লাখ টাকা করে দুটি এফডিআর করেন। তিনি ৩৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকায় একটি গাড়িও কেনেন। এদিকে, অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ায় কাস্টমস কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী ও ছেলের বিরুদ্ধেও চলমান আছে দুর্নীতি মামলা।

সর্বশেষ ৬ আগস্ট জালিয়াতি করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে আমদানি পণ্য খালাসের অভিযোগে কাস্টম হাউসের অবসরপ্রাপ্ত সাত কর্মকর্তা ও আমদানিকারকসহ মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে ১৮টি মামলা করে দুদক। আসামিরা হচ্ছেন- চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অবসরপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তা মো. শফিউল আলম, হুমায়ুন কবির, প্রাণবন্ধু বিকাশ পাল, মো. নিজামুল হক, সৈয়দ হুমায়ুন আখতার, মোহাম্মদ সফিউল আলম ও মো. সাইফুর রহমান এবং আমাদানিকারক মোহাম্মদ কাসিফ ফোরকান, মোহাম্মদ হারুন শাহ, মো. আবুল হাসনাত সোহাগ, মো. মমিনুল ইসলাম, মির্জা মো. আহসানুজ্জামান, এম এ আলীম, মো. মুসা ভূঁইয়া, মইনুল আলম চৌধুরী ওরফে মইনুল আলম মো. সাইফুল চৌধুরী, হাজি ফোরকান আহমেদ, মো. নুরুল আলম, মো. জহিরুল ইসলাম, মো. রুবেল আহমেদ, মো. আইনুল হক, মো. সাহিদুর রহমান, মো. সাইফুল ইসলাম, ফাহাদ আবেদীন সোহান ও জ্যোতির্ময় সাহা।

এ প্রসঙ্গে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১-এর কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ লুৎফুল কবির চন্দন বলেন, 'প্রতারণা ও জালিয়াতি করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে সরকারের দুই কোটি ৬৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে এসব আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।'