মাছ ও শাকসবজি রফতানি দুটি কার্গো উড়োজাহাজ কেনার ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

মাছ ও শাকসবজি রফতানির জন্য বাংলাদেশ বিমানের জন্য দুটো কার্গো উড়োজাহাজ কেনার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া বন্যা, স্রোত ও অতিবৃষ্টি থেকে সড়ক-মহাসড়কের ভাঙন ঠেকাতে বেশি বেশি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাতে পানি সড়কের ওপরে ওঠার পরিবর্তে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে যেসব জায়গায় পানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা দরকার সেখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং রাস্তার দু'পাশে বৃক্ষরোপণের জন্য প্রকল্পে বরাদ্দ রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নতুন সড়ক নির্মাণ বিষয়ে এসব অনুশাসন দেন বলে বৈঠক-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী। এদিন একনেকে তিন হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের নতুন ও সংশোধিত মিলিয়ে ১২টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে সরকার অর্থায়ন

করবে তিন হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, আর ৩০৭ কোটি টাকা আসবে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে।

কৃষি বিপণন নিয়ে একটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, পণ্যবাহী উড়োজাহাজ আমাদের দরকার। এটা

আমার মনের কথা। এটা দ্রুতই বাস্তবায়ন হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরিবেশ, পানি, হাওরের সঙ্গে খেলতে যাবেন না। এসবের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। সড়ক নির্মাণ করা হলে সেখানে প্রয়োজনীয় ব্রিজ, কালভার্ট অবশ্যই করতে হবে। দরকার হলে অতিরিক্ত ব্রিজ-কালভার্ট করতে হবে। আর যেখানে পানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা দরকার সেখানে উড়াল সড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) করতে হবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া হাওর এলাকায় খাল ও নদী খনন এবং নতুন সড়কের দু'পাশে বৃক্ষরোপণের জন্য প্রকল্পের মধ্যেই বরাদ্দ রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। পার্বত্য এলাকার সড়কের পাশে বাঁশগাছ লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সাম্প্রতিক বন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলায় এক হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের এক হিসাবে উঠে এসেছে। এসব সড়ক মেরামত করতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বাজেট বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত বরাদ্দও চাচ্ছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, সড়ক নির্মাণ ছাড়া আরও কিছু বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অনুশাসন দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, এখন থেকে কোনো ব্যক্তির গাফিলতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হলে অথবা প্রকল্পটি যে উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে সেই লক্ষ্য অর্জন না হলে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এম এ মান্নান বলেন, মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা জেলার চরফ্যাসন পৌর শহর সংরক্ষণে ২৭৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য একনেকে তোলা হয়। বছর তিনেক আগে একই ধরনের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একজন প্রকৌশলীর গাফিলতি ও ভুল মূল্যায়নের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। সেই প্রকৌশলীকে নতুন প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা হয়েছে জেনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, 'যার কারণে সরকারের অর্থের অপচয় হয়েছে, তাকে শাস্তি দেওয়া উচিত। তা না করে নতুন প্রকল্পে সম্পৃক্ত করে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। আগামীতে যাদের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে না এবং যাদের গাফিলতি ও ভুল কার্যক্রমে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হবে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।' এ পরিপ্রেক্ষিতে পানিসম্পদ মন্ত্রী শাস্তি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন বলে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এখন থেকে যেসব বড় সরকারি অফিস ভবন হবে, সেখানে অবশ্যই ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মাণ করতে হবে। কারণ নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। নারীদের কাজের সুবিধার্থে কর্মস্থলে শিশু দিবা-যত্ন থাকা দরকার। খুলনা অঞ্চলে যেসব সরকারি ভবন নির্মাণ করা হবে সেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে রাখার নির্দেশনাও এসেছে সরকারপ্রধানের কাছ থেকে। কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খুলনা এলাকায় পানি লবণাক্ত। ভবনে বৃষ্টির পানি ধরার ব্যবস্থা থাকলে সংশ্নিষ্টদের সুবিধা হবে। আগামীতে সব বিদ্যুৎ লাইন মাটির নিচ দিয়ে করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্লুইচগেট নিয়ে খুবই বিরক্ত। এজন্য আর পথেঘাটে স্লুইচগেট করা হবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এর বিকল্প খোঁজার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কত স্লুইচগেট অকেজো পড়ে আছে, তার তালিকা করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া নদীভাঙন রোধে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করার পর তা ব্যবস্থাপনায় প্রকল্প নেওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছেন।

গতকালের একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জিএনএসএস করস্‌-এর নেটওয়ার্ক পরিধি সম্প্রসারণ এবং টাইডাল স্টেশন আধুনিকীকরণ প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সাগর, নদীর জোয়ার-ভাটার তাৎক্ষণিক অবস্থা জানা যাবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এগুলো হচ্ছে থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প, সুনামগঞ্জ-মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলসুখা-আজমিরীগঞ্জ-হবিগঞ্জ মহাসড়কের শাল্লা-জলসুখা সড়ক নির্মাণ, রাঙামাটি সড়ক বিভাগের অধীন পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিভিন্ন কিলোমিটারে ড্রেনসহ স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ প্রকল্প। এ ছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধুমতি-নবগঙ্গা নদী পুনঃখননের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা প্রকল্প, মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা জেলার চরফ্যাসন পৌর শহর সংরক্ষণের সংশোধিত প্রকল্প এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বড়িকান্দি থেকে ধরাভাঙ্গা এমপি বাঁধ পর্যন্ত মেঘনা নদীর বাঁ তীর সংরক্ষণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে নাটোর জেলার সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তর জোরদারকরণ প্রকল্প অনুমোদন করেছে একনেক। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বিশেষত নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা মোকাবেলায় অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এ প্রকল্পটি বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে ২১০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ পাচ্ছে। এ ছাড়া সাইবার সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ও সক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রকল্প এবং খুলনা কর ভবন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।