ফেরি পারাপারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯      

সমকাল ডেস্ক

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় যাতায়াতের প্রধান রুট শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী এবং দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট এখন লোকে লোকারণ্য। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মানুষ ও যানবাহনের চাপে ঘাট এলাকায় এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। গত দু'দিন বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া ঠাণ্ডা থাকলেও গতকাল শনিবারের তীব্র গরম সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে ঈদে ঘরমুখো মানুষকে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্টের সীমা ছিল না। এদিকে ঘাটে ফেরি এসে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। এতে যানবাহন পারাপারেও সৃষ্টি হচ্ছে বিঘ্ন। গতকালও স্পিডবোট, লঞ্চসহ ছোট নৌযানগুলোতে ছিল প্রচণ্ড ভিড়। এ সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ঘাট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকলেও ভাড়া নৈরাজ্য কোনোভাবেই দমানো যাচ্ছে না। এদিকে পদ্মার পশ্চিম প্রান্তে কাঁঠালবাড়ী ও দৌলতদিয়া ঘাটের অবস্থা কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের দীর্ঘ জট দেখা গেছে। তবে গরুবাহী ট্রাক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপার করছে ঘাট কর্তৃপক্ষ। সমকালের সংশ্নিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো আরও খবর-

গতকাল ভোর থেকেই শিমুলিয়া ঘাটে শত  শত যানবাহন পারাপারে অপেক্ষায় জড়ো হয়। দুপুর ১টার দিকে ৭ শতাধিক যানবাহনের লম্বা সারি ছিল। পদ্মায় তীব্র স্রোত থাকায় ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে যানবাহনগুলোকে। অনেক যাত্রী বাসে শিমুলিয়া ঘাটে এসে লঞ্চ, স্পিডবোট ও ট্রলারে পদ্মা পাড়ি দিয়ে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে যাচ্ছেন। এ কারণে যানবাহনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও বাড়তি চাপ দেখা দিয়েছে শিমুলিয়া ঘাটে।

লৌহজং থানার ওসি আলমগীর হোসাইন জানান, লঞ্চ ও স্পিডবোট ঘাটেও যাত্রীদের বাড়তি চাপ থাকায় হয়রানি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা রয়েছে। প্রত্যেকটি স্পিডবোটে লাইফ জ্যাকেট রয়েছে কি-না, তা তদারকি করা হচ্ছে। লঞ্চেও অতিরিক্ত যাত্রী উঠতে দেওয়া হচ্ছে না।

বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. সোলেমান জানান, গতকাল সকাল থেকেই যাত্রীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় যাত্রীদের ঢল নেমেছে লঞ্চঘাট ও স্পিডবোট ঘাটে। নৌরুটের ৮৭টি লঞ্চ ও সাড়ে ৪০০ স্পিডবোট দিয়ে যাত্রীরা পদ্মা পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছছেন। চাপ থাকলেও যাত্রীরা যাতে ভোগান্তির শিকার না হন, সে লক্ষ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা ঘাটে দায়িত্ব পালন করছে।

একই অবস্থা পাটুরিয়া ঘাটের। গতকাল ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সারি মহাসড়কের আরপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার বিস্তৃত ছিল। যাত্রীদের ঘাট এলাকায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-পাটুরিয়া মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজটের কারণে ঘাট এলাকায় আসতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দু-তিনগুণ সময় বেশি লেগেছে। ফরিদপুরগামী গোল্ডেন লাইন বাসের চালক জাকির হোসেন জানান, সকাল ১০টায় গাবতলী থেকে বাস ছেড়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পাটুরিয়া ঘাটে এসে যানজটে পড়েন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও ফেরি পারাপার হতে পারেননি।

গতকাল সকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীমও যানজট নিরসনে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় বিকল হওয়া, অননুমোদিত যানবাহন চলাচল এবং আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতার কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ঢাকাগামী পশুবাহী যানবাহনের কারণেও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে পদ্মা পাড়ি দিয়ে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে এসেও যাত্রীরা পড়ছেন বাড়তি ভাড়ার দৌরাত্ম্যে। এমনতিই লঞ্চ-স্পিডবোটে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে, কাঁঠালবাড়ী ঘাটে আসার পর ভাড়া নৈরাজ্য আরও প্রকট হয়েছে। গোপালগঞ্জ মুকসুদপুরের যাত্রী বিলকিস আক্তার জানান, কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে মুকসুদপুর বাসে ১৫০ টাকা ভাড়া ছিল, এখন সাড়ে ৩০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ঘাটে থাকা সত্ত্বেও কিছু সিরিয়ালম্যান ভাড়া বৃদ্ধি করে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে ফেলে দিয়েছে। খুলনার কয়রা উপজেলার অপর যাত্রী বাদল কাজী জানান, তিন দিন আগেও বাসের ভাড়া ছিল ২৫০ টাকা। আজ (শনিবার) ৬০০ টাকা দিতে হয়েছে। অন্যান্য রুটের যাত্রীরাও একই অভিযোগ করেন।

অন্যদিকে, কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে দৌলতদিয়া ঘাটে। নদী পার হয়ে ঘরমুখো মানুষের ভিড় থাকলেও তেমন কোনো দুর্ভোগের চিত্র দেখা যায়নি। অতিরিক্ত ভাড়া নিয়েও কারও কোনো অভিযোগ ছিল না। পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার বন্ধ থাকায় দৌলতদিয়া প্রান্তে সরাসরি যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠতে পারছে।

ঘাট এলাকায় র‌্যাব, পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টহল দিতে দেখা গেছে। গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি রবিউল ইসলাম জানান, তাদের কঠোর নজরদারিতে ফেরির টিকিটে দালালচক্র ও ছিনতাইকারীদের তৎপরতা ঘাট এলাকায় নেই বললেই চলে। এবারের ঈদযাত্রায় দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় একটি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেনি।