সরেজমিন

সেবায় সন্তুষ্ট ডেঙ্গু রোগীরা

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯      

রাশেদ মেহেদী

হাসপাতালে ঢোকার মুখেই তথ্যকেন্দ্র। এর সামনেও মানুষের ভিড়। তবে তথ্যকেন্দ্রে যে দু'জন বসে আছেন, তাদের হাসিমুখ দেখা গেল। প্রায় ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে দেখা গেল, এ সময়ের মধ্যে ১০ জনের বেশি মানুষ তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য জানতে চাইলেন। যার যে ওয়ার্ডে যাওয়া দরকার সেখানে চলে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে অবিরাম ঘোষণা চলছে- 'আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, এই হাসপাতালে রোগীর তুলনায় জনবল কম। তাই আপনাদের একান্ত সহযোগিতা ছাড়া সবার জন্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আপনারা লাইনে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে সেবা গ্রহণ করুন।'

কথা হলো তথ্যকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী একজনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এখন বেশিরভাগ মানুষ ডেঙ্গু জ্বর পরীক্ষা কোথায় করা হয়, সেটাই জানতে চান। দোতলায় জ্বর পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর ডেঙ্গু রোগীদের জন্য একটি বিশেষ ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে ষষ্ঠ তলায়। জ্বর পরীক্ষার স্থানেও বেশ ভিড়।

কথা হলো মরিয়ম বেগম নামে এক রোগীর ছেলে মামুনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, তার মায়ের দু'দিন ধরে জ্বর। কুড়িল থেকে তিনি মাকে নিয়ে এসেছেন ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য। চারদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণেই তিনি পরীক্ষা করাতে এসেছেন। প্যাথলজি ল্যাবে কর্মরত একজন জানালেন, আসলে অনেক মানুষ ভয় থেকেই পরীক্ষার জন্য আসছে। যারা জ্বর নিয়ে আসছে, তাদের প্রায় ৫০ ভাগেরই ডেঙ্গু নেই। এ হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটেরও কোনো সংকট নেই।

ষষ্ঠ তলায় দুটি মেডিসিন ওয়ার্ডের (পুরুষ ও মহিলা) ভেতরে বিশেষভাবে খোলা হয়েছে দুটি ডেঙ্গু কর্নার। শিশু ওয়ার্ডেও বিশেষায়িত ডেঙ্গু ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। এই ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষভাবে পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার প্রতি নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানালেন কর্তব্যরতরা। দুটি ওয়ার্ডে সেবা দেওয়ার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন মূলত ইন্টার্ন বা শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। পুরুষ ওয়ার্ডে ভীষণ ব্যস্ত দেখা গেল প্রায় সাতজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে। এর বাইরে মেডিকেল অফিসার আছেন,  তারা মাঝেমধ্যে এসে খোঁজখবর নিয়ে যাচ্ছেন রোগীদের।

পুরুষ ওয়ার্ডে সোহাগ সূত্রধর নামে ভাটারা থেকে আসা এক রোগী জানালেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর গত পাঁচ দিন আগে তিনি এ হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি জানান, হাসপাতালে চিকিৎসার পরিবেশ খুবই ভালো। ডাক্তার-নার্স সবাই খুব আন্তরিক। তিনি এখন আগের চেয়ে অনেক সুস্থ বোধ করছেন। ডাক্তাররা গত রাতেই বলে দিয়েছেন, ভয়ের কিছু নেই।

রাবেয়া নামে নারী ওয়ার্ডে থাকা একজন জানালেন, তার ছোট বোন এ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে ডেঙ্গুর কারণে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। গত ছয় দিনে তাকে অনেকখানি সুস্থ করে তুলেছেন চিকিৎসকরা। এখন শরীর প্রায় স্বাভাবিক। এ হাসপাতালের দেওয়া খাবার-দাবারও ভালো বলে জানান তিনি। বোনের সঙ্গে থেকে তিনি দেখেছেন, গত কয়েক দিনে আরও কয়েকজন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছেন।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জামিল আহমেদ সমকালকে জানালেন, গতকাল শনিবার পর্যন্ত হাসপাতালে ৩৭৯ জন

ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৭২ জন। গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে ১ হাজার ৩৮০ জন ডেঙ্গু রোগী সেবা নিয়েছেন। ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে এখন পর্যন্ত কেউই মারা যাননি। যেসব রোগীর অবস্থা খুব খারাপ হচ্ছে তাদের আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিনজন ডেঙ্গু আক্রান্তকে আইসিইউতে পাঠানো হয়। এর মধ্যে একদিন শুধু পাঁচজনকে আইসিইউতে পাঠানো হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, এ মুহূর্তে রোগীর চাপ আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে। ফলে চিকিৎসকদের অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৩০০টি অতিরিক্ত বেড সংযোজন করা হয়েছে। যদিও সব বেড ওয়ার্ডের ভেতরে দেওয়া যায়নি। বারান্দায় বেড বসানো হয়েছে। কিন্তু সব রোগীই বেডে আছে। কেউ মেঝেতে নেই। রোগীদের জ্বর পরীক্ষার জন্য ল্যাবে আলাদা কাউন্টার করা হয়েছে। পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক কাউন্টার আছে। শিশুদের জন্য পৃথক কাউন্টারসহ শিশু ওয়ার্ডেও অতিরিক্ত বেড দেওয়া হয়েছে।

পরিচালক বলেন, রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা সুনিশ্চিত করার জন্য যতটা ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তার সর্বোচ্চটাই নেওয়া হয়েছে।