গাড়ির ধীরগতি, উত্তরের পথে যাত্রীদের নাভিশ্বাস

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯      

সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

নাজিম উদ্দিনের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুরে। পেশায় পোশাককর্মী। ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফিরতে শুক্রবার রাত ৮টায় ঢাকার গাবতলী থেকে ট্রাকে ওঠেন তিনি। তবে ২০ ঘণ্টায় মাত্র ১২৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারেন। গতকাল বিকেল ৪টা। তীব্র যানজটের কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ের পাঁচিলা নয়নভাটার সামনে আটকে থাকে তাদের গাড়ি। প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করছেন নাজিম। তার সঙ্গে থাকা অন্য যাত্রীদেরও একই অবস্থা। এরই মধ্যে নয়নভাটার ভেতরে একটি টিউবওয়েল দেখে হঠাৎ দৌড়ে গেলেন নাজিম। হাত-মুখে পানি ছিটানোর পাশাপাশি শুকিয়ে যাওয়া গলা ভেজালেন। যেন প্রাণটা জুড়িয়ে গেল তার। এ সময় নিজের পাশেই অনেককে একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। সবারই চোখেমুখে তীব্র কষ্টের ছাপ। এভাবে টানা দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ বাসের হর্ন বেজে ওঠায় সবাই যার যার গাড়ির উদ্দেশে স্বস্তির দৌড় দিলেন। নাজিম ট্রাকের ওপর তপ্ত হয়ে থাকা পলিথিনের ছাউনির নিচে বসে পড়লেন। গতকাল সরেজমিন ঘুরে এভাবে ঈদে ঘরমুখো মানুষের অসহনীয় দুর্ভোগ চোখে পড়ে।

সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল গোলচত্বরের অ্যারিস্টোক্র্যাট হোটেল ও ফুডভিলেজ-সংলগ্ন পূর্বদিকে ইছামতি নদীর ওপর ছোট সরু সেতুটির কারণে এমনিতেই ক'দিন ধরে সেখানে যানজট লেগে থাকছে।

তার ওপর হাইওয়ে পুলিশ ডিভাইডার দিয়ে লেন আলাদা করায় গাড়ির কচ্ছপগতি সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা-পাবনাগামী 'পাবনা এক্সপ্রেস' বাসের সুপারভাইজার মালেক বলেন, ভাই ছবি তুলে কী করবেন, ঢাকা থেকে হাটিকুমরুল মোড় আসতেই ১৮-২০ ঘণ্টা। এ মহাসড়কে ক'দিন থেকেই এ ধরনের যানজট রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে সয়দাবাদ থেকে কড্ডা ও নলকা হয়ে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার অংশেই যানজট রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যানজট নিয়ন্ত্রণে হাঁসফাঁস উঠেছে।

গতকাল সকালে ঢাকার গাবতলী থেকে যাত্রা করে দুপুর ১টা পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলও পৌঁছাতে পারেননি অনেকে। সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার পাঁচিলা গ্রামের গামছা ব্যবসায়ী দুদু মিয়া জানান, টাঙ্গাইলের রসুলপুর সবুর পাম্পের কাছে স্থানীয় বাজারে গামছা বিক্রির জন্য যান শুক্রবার। গতকাল সকাল ৬টার দিকে সেখান থেকে পাঁচিলার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। মাত্র ৪৫ কিলোমিটার রাস্তা আসতে সাড়ে ছয় ঘণ্টা লাগে তার।

পাঁচিলায় কথা হয় ঢাকা থেকে কুরিগ্রামগামী ট্রাকের যাত্রী সবুর মিয়ার সঙ্গে। গতকাল দুপুরে তিনি জানান, শুক্রবার সকাল ৯টায় গাবতলী থেকে যাত্রা করি। পাঁচিলা পর্যন্ত ১২২ কিলোমিটার পথ আসতে ১৬ ঘণ্টা লেগেছে। ট্রাকে রোদের মধ্যে দড়ি ধরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। সবুর বলেন, কখন বাড়ি যাব জানি না। তার পরও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছি।

পাঁচিলা মোড়ে দেখা যায়, ট্রাক ও বাসের ছাদেও যাত্রীরা উঠেছেন। গরমে তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। এর মধ্যে হকাররাও খাবারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। চাহিদা বেশি থাকায় এ খাবারও মিলছে না।

বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার ওসি সৈয়দ সহিদ আলম বলেন, যানবাহনের চাপ এতটাই বেশি যে, আমরাও হিমশিম খাচ্ছি। সকাল থেকে সেতুর পশ্চিম পাড়ে যানজট না থাকলেও টাঙ্গাইল প্রান্তে প্রচণ্ড যানজট রয়েছে। কড্ডা থেকে নলকা পর্যন্তও থেমে থেমে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি মো. আকতারুজ্জামান বলেন, নলকার পূর্বপাড়ে থেমে থেমে যানজটের প্রভাব পাঁচিলাতেও পড়ছে। দুপুরের পর অবস্থা বেগতিক হলেও বিকেল সোয়া ৪টার পর তা কমতে থাকে।

এদিকে, শুক্রবার মধ্যরাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত পাঁচবার টোল আদায় বন্ধ করেছে বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির মধ্যে আটকা থাকেন যাত্রীরা। গতকাল দুপুর আড়াইটার পর থেকে থেমে থেমে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মহাসড়কের দুটি স্থানে গাড়ি বিকল হয়েছিল। পরে ওই গাড়িগুলোকে রেকার দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া বৃষ্টি ও এলেঙ্গায় দুই লেনের সড়কের অবস্থা খারাপ হওয়ায় এখানে গাড়ির গতি কমে আসে। অন্যদিকে যানবাহনের বাড়তি চাপ এবং চালকদের প্রতিযোগিতা ও খেয়ালখুশিমতো গাড়ি চালানোর কারণেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। মির্জাপুরের নাটিয়াপাড়া, করটিয়া, টাঙ্গাইল শহর বাইপাস, রাবনা বাইপাস, রসুলপুর ও বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে হাজার হাজার গাড়ি আটকে থাকে।

টাঙ্গাইলের ট্রাফিক পরিদর্শক এরশাজুল হক জানান, সেতুর পশ্চিম প্রান্তে গাড়ি টানতে না পারায় এখানে যানবাহন আটকে থাকে। সব গাড়ি সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। তবে ঢাকামুখী সড়কে কোনো যানজট নেই।

বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকায় দায়িত্বরত মধুপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার কামরান হোসেন জানান, সিরাজগঞ্জের দিকে গাড়ি টানতে না পারায় সেতুর ওপর শত শত গাড়ি আটকা পড়ে। সেতুর পশ্চিম প্রান্তে সিরাজগঞ্জে এক লেনের রাস্তা। এখানে ভয়াবহ যানজটের কবলে পড়ছে গাড়িগুলো। উত্তরবঙ্গের দিকে গাড়ি টানতে পারছে না। ফলে টোলপ্লাজা বন্ধ রাখা হচ্ছে। গতকাল দুপুর আড়াইটা থেকে টোলপ্লাজা খুলে দেওয়া হয়। তখন থেকে থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করছে।