নাটোর

ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা শতকোটি টাকা

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯      

নবীউর রহমান পিপলু, নাটোর

ট্যানারি শিল্প মালিকদের কাছে পাওনা প্রায় শতকোটি টাকা। বকেয়া টাকা না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নাটোরের চামড়া ব্যবসায়ীরা। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে প্রতিষ্ঠান ধোয়ামোছা করলেও অর্থের জোগান করতে না পারায় এবারের মৌসুমে চামড়া কেনা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন তারা। এতে এবার চামড়া ব্যবসায় নজিরবিহীন ধসসহ পাচার হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা।

নাটোরের চকবৈদ্যনাথ এলাকায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার মোকাম হওয়ায় কেনাবেচার মৌসুম উপলক্ষে নানামুখী প্রস্তুতি নিয়েছেন স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা। এখানে ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় আড়াইশ'। এই মোকাম থেকে প্রতি মৌসুমে ৫ থেকে ৭শ' কোটি টাকার চামড়া বেচাকেনা হয়। কিন্তু ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে গত কয়েক মৌসুমের বকেয়া না পাওয়ায় নাটোর চামড়া মোকামে প্রাণচাঞ্চল্য নেই এবার। থমকে গেছে কার্যক্রম। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আর ক'দিন পর কোরবানির ঈদ। অথচ মৌসুমের এই সময়ে টাকার জেগান নেই। গত মৌসুমে অনেকেই দাম না পেয়ে ছাগল ও ছোট গরুর চামড়া মাটিচাপা দিয়েছেন। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না পেলে এবার নাটোরের চামড়া মোকামে ধস নামার আশঙ্কা করছেন অনেকে।

ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বিগত কয়েক মৌসুমের প্রায় ৫০ কোটি টাকা এবং গত মৌসুমের সমপরিমাণ টাকাসহ প্রায় শতকোটি টাকা বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণসহ অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা।

এদিকে গত মঙ্গলবার ঘোষিত মন্ত্রণালয় নির্ধারিত সংগ্রহ দরে রাজধানী ঢাকার বাইরে গরু ও মহিষের চামড়া কেনা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন চকবৈদ্যনাথের আড়তদার ও স্থানীয় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। আড়তদারদের দাবি, নির্ধারিত দামে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করে না। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচা চামড়া সংগ্রহে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে কোনো বছরেই সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনেন না আড়তদাররা। মঙ্গলবার প্রতি বর্গফুট গরু ও মহিষের কাঁচা চামড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা ও বকরির চামড়ার দাম ১৩ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গুরুদাসপুর উপজেলার চাচকৈরের মৌসুমি ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান বলেন, 'কাঁচা চামড়া কিনতে সরকার আড়তদারদের যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, তাতে কাঁচা চামড়া বিক্রি করা আদৌ সম্ভব নয়। কারণ কোরবানিদাতারা পশুর চামড়ার ভালো দাম পেতে চান, যা তাৎক্ষণিক দর কষাকষির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।'

সদর উপজেলার মৌসুমি ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দীন বলেন, 'চামড়া যে দামেই আমরা কিনে থাকি, তা আড়তে বিক্রির পূর্ব পর্যন্ত নিজস্ব উদ্যোগে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। লবণসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় চামড়ার ক্রয়মূল্যের সঙ্গে যোগ করে আড়তে বিক্রি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে কতদিন নিজস্ব উদ্যোগে চামড়া সংরক্ষণ করতে হবে, তা অনিশ্চিত। কাজেই এসব খরচের বিপরীতে প্রতি বর্গফুট গরু-মহিষের চামড়া সর্বোচ্চ ৪০ টাকায় বিক্রি করা মানে নিজের পুঁজি খোয়ানো।'

অপরদিকে আড়তদাররাও নির্ধারিত দামে চামড়া সংগ্রহে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। প্রতি বছর নির্ধারিত দরে চামড়া সংগ্রহে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় বলে দাবি তাদের।

জেলার চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন চামড়া ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সহসভাপতি হবিবুল্লাহ বলেন, 'এমনিতেই অর্থ সংকটের মধ্যে রয়েছি আমরা। এ াড়া চামড়ার দামও কম। এবারেও বেঁধে দেওয়া দরে চামড়া কিনলে লোকসান গুনতে হবে। গত ৪/৫ বছর ধরে ঢাকার ট্যানারি মলিকরা তাদের বকেয়া কয়েক কোটি টাকা পরিশোধ করছেন না। যে কারণে আমরাও বাইরের অন্যান্য জেলার চামড়া ব্যবসায়ীদের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছি না। তাই এবার চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়তে হবে।

চামড়া ব্যবসায়ী মালিক গ্রপের উপদেষ্টা মুনজুরুল ইসলাম হিরু বলেন, 'কোরবানির কয়েক দিন আগে চামড়ার সংগ্রহ মূল্য কমিয়ে দেওয়া হয়। এ মূল্য অনুসরণ করে চামড়া কেনা যায় না। ভালো দাম পেতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রি না করে সংরক্ষণ করলে বাজারে সংকট দেখা দেয়। তখন আড়তদাররা জিম্মি হয়।'

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সভাপতি শরিফুল ইসলাম শরিফ বলেন, 'ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা টাকা না পাওয়ায় এবার অনেকেই চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারেননি। এতে এখানকার প্রায় আড়াইশ' ব্যবসায়ীর দিশেহারা অবস্থা। অনেকেই টাকার অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে রয়েছেন।' তিনি আরও বলেন, 'চামড়া সংগ্রহের নির্ধারিত মূল্য বাজারে কোনো প্রভাব ফেলে না। তাই এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের চিন্তার সুযোগ নেই। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে নির্ধারিত দর অতিক্রম করেই চামড়া কিনতে হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়ার বড় একটি অংশ সরবরাহ করে থাকে। তাই তাদের সিদ্ধান্তই বাজারে প্রতিফলিত হয়।'