আমিনবাজার ডাম্পিং স্টেশন বন্ধের নির্দেশ

দূষণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রাজধানীতেও

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

মসিউর রহমান খান

সাভারের আমিনবাজারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বর্জ্য ডাম্পিংয়ের প্রভাবে রাজধানীজুড়ে দূষণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই বর্জ্য ডাম্পিংয়ের ল্যান্ডফিল্ডটি অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এক যুগ ধরে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই এটি চালাচ্ছে ডিএনসিসি। এর আগে কয়েক দফা তাদের নোটিশ দেওয়া হলেও তার কোনো জবাব পায়নি পরিবেশ অধিদপ্তর।

তবে গত সপ্তাহে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এই ল্যান্ডফিল্ডটিকে বন্ধের পরিবর্তে আরও বিস্তৃত ও পরিবেশ সহায়ক করতে তাদের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। তাদের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরকে এসব কথা জানানো হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ৫০ একর জমির ওপর এই ডাম্পিং স্টেশন হলেও এর চারপাশের সীমানা ওয়াল উপচে প্রায় ৮০ একর জমিতে বর্জ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এর গন্ধ ছড়াচ্ছে আরও বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যাতায়াতকারী সব যাত্রীকেই গাড়ির মধ্যে নাক চেপে পার হতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে ওই এলাকায় স্বাভাবিক চলাচলের উপায় নেই। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, এই ডাম্পিং স্টেশনটি বন্যাপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। কোনোভাবেই এখানে ল্যান্ডফিল্ড হতে পারে না। ওই এলাকার দূষণ খুব সহজেই রাজধানীবাসীর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন, স্থানগত ছাড়পত্র নিয়ে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের কাজ করা যায় না। এত দিন ধরে আমিনবাজারে সিটি করপোরেশন কীভাবে এই কাজ করছে, সেটাও একটা প্রশ্ন।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মঞ্জুর হোসেন বলেছেন, ৫০ একর জমিতে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের এই ল্যান্ডফিল্ডটি ২০০৫ সালে চালু হয়। এই স্থানে আরও ৮০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে একটি প্রকল্পে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন। এ প্রকল্প অনুমোদন হলে ১৩০ একর জমিতে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে। জমি অধিগ্রহণের সুযোগ তৈরি হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া যাবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেই চ্যালেঞ্জ থাকছেই। তবে বন্যাপ্রবণ হলেও পানি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, তার জন্য ল্যান্ডফিল্ডের চারপাশে প্রাচীর করা রয়েছে। এখানে বর্জ্যের গার্বেজে এক ধরনের লিকুইড তৈরি হয়, যা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানিতে পরিণত হয়। ওই পানি ব্যবহার করেই সেখানে থাকা অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছ চাষেরও ব্যবস্থা রয়েছে। করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযোগ, এ ধরনের ল্যান্ডফিল্ড স্থাপনের জন্য ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও খোদ ডিএনসিসি তা মানেনি। ছাড়পত্র ছাড়াই নির্মিত এই ল্যান্ডফিল্ডে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার টনেরও বেশি বর্জ্য ফেলা হয়। ফলে ওই এলাকার কয়েক লাখ মানুষ ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহাম্মদ জানিয়েছেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তারা ডিএনসিসিকে ওই ডাম্পিং স্টেশনটি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে কয়েক দফা তাদের লিখিত নোটিশ দেওয়া হলেও তারা আমলে নেয়নি। সর্বশেষ গত  সপ্তাহে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র একজন প্রকৌশলীকে সরেজমিনে পাঠিয়েছিলেন। এরপর তাদের পক্ষ থেকে একটি লিখিত জবাবও পাওয়া গেছে। এতে তারা জানিয়েছেন, নতুন ডাম্পিং স্টেশনের জন্য তারা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। আগামী এক বছরের মধ্যে তারা এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবেন। সিটি করপোরেশনের এই জবাব কমিটির ২৯ জুলাইয়ের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। সংসদীয় কমিটির পরবর্তী নির্দেশ অনুযায়ী তারা পদক্ষেপ নেবেন।

গত ৫ মে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির চতুর্থ বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, আগের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমিনবাজার এলাকায় উত্তর সিটির ময়লা-আবর্জনা ডাম্পিংয়ের ফলে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে জানিয়ে এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য করপোরেশনকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ১০ দিনের সময় দিয়ে ওই নোটিশ দেওয়া হলেও করপোরেশনের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

বৈঠকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য করপোরেশনের ওপর চাপ সৃষ্টির মত দেন পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় যে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে দ্বিধা করবে না মন্ত্রণালয়। করপোরেশনের সহযোগিতা না পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে মন্ত্রণালয় বাধ্য হবে।

কমিটি সূত্র জানিয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে এখানে বর্জ্য ডাম্পিং শুরু হলেও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই এত দিন ধরে কীভাবে বন্যাপ্রবণ স্থানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে আমিনবাজারের ৫০ একর জমিতে এই ডাম্পিং স্টেশনটি তৈরি হয়। ২০০৭ সাল থেকে এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুরু হয়। এর মেয়াদ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও বর্জ্য ফেলানোর কাজ বন্ধ নেই।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির বর্জ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আমিনবাজার ল্যান্ডফিল্ডটি ভরাট হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে আরও ৮১ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য জিওবি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের জন্য নাসিরাবাদ এলাকায় জায়গা অধিগ্রহণের জন্য জিওবি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।