ওয়ার্কার্স পার্টির সেমিনারে রেহমান সোবহান

চীনের এক অঞ্চল এক পথ থেকে লাভবান হবে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

 চীনের এক অঞ্চল এক পথ থেকে লাভবান হবে বাংলাদেশ

শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ওয়ার্কার্স পার্টি আয়োজিত 'ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগ এবং নতুন অর্থনৈতিক নির্দেশক' শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান- সমকাল

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেছেন, চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড বা এক অঞ্চল এক পথ উদ্যোগ হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। যেখানে অংশ নেওয়া দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় সাধারণ এজেন্ডা থাকতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ এ উদ্যোগ থেকে লাভবান হবে। আর ভারত ও জাপান যদি এ উদ্যোগে যুক্ত হয়, তাহলে একুশ শতকে এশিয়া হবে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ামক।

গতকাল শনিবার বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি আয়োজিত 'ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগ এবং নতুন অর্থনৈতিক নির্দেশক' শীর্ষক সেমিনারে তিনি এমন মতামত দেন। সেমিনারে তিনি মূল বক্তা ছিলেন।

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড হচ্ছে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা। ২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ উদ্যোগ নেন। এই পরিকল্পনার মধ্যে প্রাথমিকভাবে রয়েছে এশিয়া ও ইউরোপের ৬০টি দেশকে চীনের মূল ভূখণ্ডে সংযুক্ত করা। সড়কপথে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। এই সড়কপথের সঙ্গে রেলপথ ও তেলের পাইপলাইনও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই সঙ্গে সমুদ্রপথেও, বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। বলা হয়ে থাকে, প্রাচীন সিল্ক্ক রুটের আধুনিক সংস্করণ এটি। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ এতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়। এই পরিকল্পনায় দুটি 'ইকোনমিক করিডোর' তৈরিরও উদ্যোগ রয়েছে। একটি কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ। আর দ্বিতীয়টি, চীনের জিনজিয়াং থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সমুদ্রবন্দর গাওদার পর্যন্ত রেল ও সড়কপথ। এই করিডোরের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে।

রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদেশ এ উদ্যোগ থেকে লাভবান হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে কোন প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তা গুরুত্বপূর্ণ। এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তা  নির্ধারণে আঞ্চলিক উপকমিটি গঠন করা যেতে পারে। যাতে সহযোগিতার আঞ্চলিক এজেন্ডাগুলো আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। তিনি বলেন, ভারত এ উদ্যোগের বাইরে থাকছে। তবে কেন বাইরে থাকছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। এক্ষেত্রে ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে এর কারণ খুঁজে বের করতে পারেন। কারণ ভারত ও জাপান এই উদ্যোগে যুক্ত হলে তা হবে একুশ শতকের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য মাইলফলক।

সিপিডির চেয়ারম্যান বলেন, চীনের বাইরে চিন্তা করার সুযোগ নেই। খেলনা থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির সব খাতেই বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির পণ্য চীন থেকে তৈরি হচ্ছে। আগামীতে বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে এশিয়া, যার নেতৃত্বে থাকবে চীন। কারণ চীনের অর্থায়ন অনেক বাড়ছে। পশ্চিম থেকে বিশ্ব এখন দক্ষিণ-দক্ষিণ উদ্যোগে সরে আসছে। পশ্চিমা অর্থায়নের বিকল্প এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) করেছে চীন।

সেমিনারে বিশেষ বক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পালাবদল হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পরাশক্তির অবস্থান হারিয়ে ফেলেছে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখন প্রচণ্ড আগ্রাসী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এদিকে ভারত ও চীনের মধ্যেও ভালো ভাব নেই, এটাও একটা সমস্যা। ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠিত বিসিআইএম উদ্যোগ জোর পেলেও মোদি সরকার আসার পর তা পাচ্ছে না। উল্টো মোদি সরকার বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া, নেপালের সমন্বয়ে বিবিআইএন করতে চাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে উভয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে। যদিও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য গভীর একটি সমুদ্রবন্দর খুবই জরুরি। চট্টগ্রাম বন্দর পঙ্গু হয়ে পড়েছে। ১৯০ মিটারের বেশি লম্বা এমন জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। এদিকে পায়রা বন্দর করা হচ্ছে, কিন্তু বন্দরটি মূল নদীর ৩০ কিলোমিটার ভেতরে। ফলে এটি কখনও গভীর সমুদ্রবন্দর হতে পারবে না। আর এ বন্দর কার্যকর রাখতে যে পরিমাণ ড্রেজিং করতে হবে, তার ব্যয়ও বিশাল। তিনি বলেন, ভারত, চীনের রাজনীতির কারণে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর হয়নি। বাংলাদেশ চীনকে সোনাদিয়া বন্দর করার প্রস্তাব করলেও চীন শেষ পর্যন্ত চলে গেছে। সোনাদিয়া বন্দরে চীন কাজ করতে না পেরে মিয়ানমারে বন্দর করেছে, বাংলাদেশের জলসীমার কাছে মিয়ানমারের গ্যাস উত্তোলন করে নিজেদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আবার ভারত তাদের সেভেন সিস্টার্সের সুবিধায় মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যক্রম নিয়েছে। ভারতও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পাশে নেই। এজন্য বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে ভারত, চীনের বিষয়ে কৌশলী হতে হবে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বিশাল সুযোগ। কিন্তু বাংলাদেশকে খেয়াল রাখতে হবে যেন সরবরাহ ঋণে আটকে না যায়।

বিশেষ বক্তা সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া সাবেক সচিব ইনাম আহমদ চৌধুরী বলেন, চীনের এই এক অঞ্চল এক পথ উদ্যোগে এ অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়নের নীতি, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থপ্রবাহ, সাংস্কৃতিক উন্নয়নসহ সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। আশা করা যায়, এ অঞ্চলের দেশগুলো এতে যুক্ত হয়ে লাভবান হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, তার দল বৈষম্য, শ্রম স্বার্থ রক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে সবসময় কাজ করে আসছে। ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, পশ্চিমাদের কর্তৃত্ব কমছে। এশিয়ার নেতৃত্বের সময় এসেছে। পুঁজিবাদের অর্থনীতির পরিবর্তে সবাইকে নিয়ে এগোনোর কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেবে চীন। বাংলাদেশও তার অংশ হবে।