রেলের সম্পত্তি: কালো থাবা-৮

কৃষির জন্য ইজারা নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহার

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জে বেদখল হয়ে আছে রেলের কোটি কোটি টাকার জমি। রেলস্টেশনের উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রেললাইনের দু'পাশে এসব জমির অবস্থান। কৃষিকাজে ব্যবহারের কথা বলে অল্প টাকায় ইজারা নেওয়া এসব জমি ব্যবহার করা হচ্ছে বাণিজ্যিক কাজে। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গুদাম, স'মিল, বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়। অনেকেই আবার বহুতল ভবনের ভিত্তিসহ গড়ে তুলেছেন মজবুত দালান। কেউ কেউ আংশিক জমি ইজারা নিয়ে দখল করেছে অনেক বেশি জমি। ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলেও তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ। তাই দিনে দিনে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন এসব দখলদার।

কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনের পাশের রেলের জমিতে মার্কেট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি গাজী আব্দুল হক। 'গাজী মার্কেট' ওই স্থাপনার ৩০টি দোকান করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তিনি জমিটি কৃষিকাজে ব্যবহারের কথা বলেই রেলের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছেন। গাজী আবদুল হক বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কৃষি জমি হিসেবে জমিটি ইজারা নিলেও পরে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছেন। এ জন্য তাকে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়েছে। তার দাবি, এ মার্কেটের কারণে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে রেলের প্রয়োজন হলে যে কোনো সময় জমি ছেড়ে দেবেন বলে জানান তিনি। একইভাবে রেলের  জমিতে অবৈধভাবে বাজার তৈরি করেছেন শহরের তারাপাশা এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমীন। তিনি জানান, বাজার স্থাপন করলেও জমিটি কৃষি কাজের জন্যই ইজারা নেওয়া হয়েছে। এখানে দোকানগুলো তৈরি করতে তার অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এলাকার মানুষের প্রয়োজনেই বাজার বসানো হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ ফেরত চাইলে তিনি তা দখলমুক্ত করে দেবেন। কিশোরগঞ্জে রেলের জমিতে একইভাবে স'মিল স্থাপনকারী হেলাল উদ্দিন ও শাহীন মিয়া, গুদামের মালিক ওসমান গণি ও সানোয়ার হোসেনসহ ১০-১২ জন জানান, তারা কৃষিজমি হিসেবে ইজারা নেওয়ার পর সেখানে মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করেছেন। খালি জায়গা পতিত না রেখে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি এখানে নতুন এসেছেন। তবে রেলের জমি দখলের যে চিত্র তিনি দেখছেন, তা বিস্ময়কর। কোটি কোটি টাকার জমি কৃষিকাজে ইজারা নিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে। এখনই তাদের উচ্ছেদ না করা হলে জমিগুলো স্থায়ীভাবে বেদখল হয়ে যাবে। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

রেলের পূর্বাঞ্চল জোনের এস্টেট বিভাগের সার্ভেয়ার ফয়েজ মিয়া বলেন, এসব জমির পুরোটা ইজারা দেওয়া হয়নি। কোনো কোনো জমির আংশিক চাষাবাদের নামে ইজারা নিয়ে পুরোটা দখল করা হয়েছে। চাষের জমিতে মার্কেট থেকে শুরু করে নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তৈরি দখলদারিত্ব কায়েম করা হয়েছে। রেলের উপ-বিভাগীয় সহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান বলেন, কিশোরগঞ্জে রেলের জমি দখল বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে রেলপথের সুরক্ষা হুমকিতে পড়বে। স্বাভাবিক রেল চলাচল বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে।

কিশোরগঞ্জ জিআরপি থানার ওসি আব্দুর রহমান বিশ্বাস বলেন, দখলদাররা সবাই প্রভাবশালী। এ বিষয়ে জিআরপি পুলিশের তেমন কিছু করণীয় নেই। রেলের এস্টেট বিভাগ সক্রিয় না হলে জমি উদ্ধার করা কঠিন হবে। এস্টেট বিভাগ উদ্যোগী হলে জিআরপি পুলিশ সার্বিক সহযোগিতা করবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কিশোরগঞ্জ জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ চৌধুরী বলেন, রেলস্টেশনের জমি ইজারা বা বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সেখানে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ইজারা দেওয়ায় তৈরি হয়েছে এক মহাসংকট। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে রেলের জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।