তবুও নাম 'ট্রমা' সেন্টার

ডাক্তার-নার্স নেই নেই ওষুধপত্র

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, অপারেশন থিয়েটার নেই, নেই নার্স-আয়া। তবুও নাম তার 'ট্রমা সেন্টার'। দুর্ঘটনায় পড়া লোকজনকে চিকিৎসা দিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের মাঝামাঝি লোহাগাড়ায় এ ট্রমা সেন্টারটি নির্মাণ করা হয় সেই ২০১২ সালে। ২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এটির উদ্বোধনও করেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সেই থেকে এখনও চালুই করা যায়নি ট্রমা হাসপাতালটি। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে সাত বছরের বেশি সময়।

লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গা ঘেঁষে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনতলা বিশিষ্ট ট্রমা সেন্টারটি ২০ শয্যার। এর মধ্যে দুটি শয্যা ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু হাসপাতালটি শুধুই নাম আর ভবনসর্বস্ব। এখানে দুর্ঘটনায় পড়া কোনো রোগীর চিকিৎসা আজও হয়নি। ট্রমা সেন্টারটি চালু করতে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন অফিস থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একের পর এক চিঠি দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা সরেজমিন ঘুরেও যান। কিন্তু কাজের কাজ কিছইু হয় না। চিকিৎসক, নার্স কেউ নিয়োগ পান না।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, উন্নয়ন খাতের আওতায় ভবনটি নির্মাণ করা হলেও প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে নেওয়া যায়নি। সৃষ্টি করা যায়নি লোকবলের পদ। মূলত এই জটিলতায় নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না লোকবল। চালু করা যাচ্ছে না ট্রমা সেন্টার।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে লোহাগাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রসূতি ইউনিটের কিছু কাজ চলছে পড়ে থাকা ট্রমা সেন্টারে। কিছুদিন আগে লোহাগাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থোপেডিক সার্জারি) ডা. মাহমুদুর রহমান ট্রমা সেন্টারের একটি কক্ষে বসে রোগীদের চিকিৎসা দিতেন। অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালটিতে এখন অর্থোপেডিক কোনো চিকিৎসকও নেই।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, 'ট্রমা সেন্টারটি চালু করতে হলে ডাক্তার, নার্স, আয়া লাগবে। আসবাবপত্র লাগবে। অপারেশন থিয়েটার লাগবে। খাবারের জন্য বরাদ্দ লাগবে। কিন্তু এগুলোর কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি। বিভিন্ন সময় আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি লিখিত জানিয়েছি। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি।

জনবলের কাঠামো অনুযায়ী, লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারে একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, দু'জন করে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থোপেডিক সার্জারি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (জেনারেল সার্জারি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিওলজি), একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি), সহকারী সার্জন আটজন, আটজন সিনিয়র স্টাফ নার্স, দু'জন অপারেশন থিয়েটার (ওটি) নার্স, একজন পরিসংখ্যানবিদ, ক্যাশিয়ার, স্টোরকিপার, অফিস সহকারী, দু'জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব), একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফার), দু'জন করে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফার্মাসিস্ট), গাড়িচালক, একজন জুনিয়র মেকানিক, চারজন ওটিবয়, দুইজন ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট, আটজন ওয়ার্ডবয়, চারজন আয়া, দু'জন কুক, চারজন করে দারোয়ান ও সুইপার চারজন। সব মিলিয়ে বিভিন্ন পদে ৭৪ জনের পদ সৃষ্টির কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদেই লোকবল নিয়োগ দেওয়া যায়নি।

লোকবল না থাকাকেই ট্রমা সেন্টারের কার্যক্রম শুরু করতে না পারার মূল কারণ বলছেন লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ হানিফ। তিনি বলেন, 'ট্রমা সেন্টার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন একটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে। ট্রমা সেন্টারের জনবল কাঠামোসহ (অর্গানোগ্রাম) আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিও আলাদা। উদ্বোধনের পর অল্পকিছু আসবাবপত্র পাওয়া গেলেও জনবল নিয়োগ ও যন্ত্রপাতি না থাকায় ট্রমা সেন্টারের কার্যক্রম শুরুই করা যাচ্ছে না।'

বর্তমানে ট্রমা সেন্টার পরিস্কারের দায়িত্বে থাকা লোহাগাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঝাড়ূদার সাগরিকা বসাক জানান, অনেকেই মনে করেন ট্রমা সেন্টারে এলে চিকিৎসা পাবেন। এ কারণে দুর্ঘটনায় আহতসহ প্রতিদিন ২০-২৫ জন হাড়ভাঙ্গা রোগী ট্রমা সেন্টারে আসেন। কিন্তু তাদের ফিরে যেতে হয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কটি খুবই

বিপজ্জনক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়কগুলোর একটি। দুই লেনের সড়কটির স্থানে স্থানে রয়েছে অনেক বিপজ্জনক বাঁক। অনেক চালক এসব বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে প্রায় সময় ছোট-বড় দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। এসব দুর্ঘটনায় ঘটছে হতাহতের ঘটনা। দুর্ঘটনায় পড়া লোকজনের কথা মাথায় রেখে ট্রমা সেন্টারটি গড়ে তোলা হলেও তা কোনো কাজেই আসছে না। চিকিৎসার আশায় এই সেন্টারে গিয়ে বিমুখ হয়ে ফিরতে হচ্ছে দুর্ঘটনায় মরণাপন্ন লোকজনকে।