চট্টগ্রামে প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে ৬ জন

সাত দিনে শনাক্ত ৩৮ রোগী

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

পেশাগত কাজে ঢাকায় গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকার বাসিন্দা মো. সাগর। ঢাকায় পাঁচ দিন থেকে চট্টগ্রামে ফিরে আসার একদিন পরই তার শরীরে দেখা দেয় জ্বর। পরে শুরু হয় শরীরজুড়ে ব্যথা। চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন তিনি। তার শরীরে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশার সংক্রমণ পান চিকিৎসকরা। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন তিনি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ঢাকায় অবস্থান করার সময় ডেঙ্গু মশা কামড় দিয়েছে তাকে। সাগরের মতো চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। আর ঢাকার এমন প্রভাবের কারণে ধীরে ধীরে ডেঙ্গুর বিস্তার হচ্ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও। চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তদের ৯৯ শতাংশই ঢাকাফেরত। বর্তমানে চিকিৎসাধীন থাকাদের মধ্যে শুধু একজন রোগী পাওয়া গেছে, যিনি চট্টগ্রামে অবস্থান করা অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ছয়জন করে রোগী ভর্তি হচ্ছেন চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে। মাত্র তিন দিনে ১৭ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে গত শুক্রবার একদিনেই শনাক্ত হয়েছেন সাতজন নতুন রোগী। গত এক সপ্তাহে আক্রান্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ জনে। অথচ গত ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৫৪ জন। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হন ৬৬ জন, যা ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৭ জনে। চট্টগ্রাম মহানগরের বাইরেও প্রতিদিন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত অনেকে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন।

এদিকে, ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে সবার মধ্যে। তবে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এডিস মশার বিস্তার ঠেকাতে সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখার কথা জানান তিনি। অন্যদিকে, নগরীতে মশকনিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম, সচেতনতামূলক  লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন নয়জন, বেসরকারি মেডিকেল সেন্টারে পাঁচজন, ম্যাক্স ন্যাশনাল ও সিএসসিআর হাসপাতালে দু'জন করে এবং রয়েল হাসপাতাল ও পার্কভিউ হাসপাতালে একজন করে চিকিৎসাধীন।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের শুরু থেকে তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র আটজন। কিন্তু গত সাত দিনে (২০ থেকে ২৬ জুলাই) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ জনে। চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ দিনে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৫ রোগী, যাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ছয়জন। এদিকে, গতকাল শনিবার নতুন আরও ছয়জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে চমেক হাসপাতালে পাঁচ এবং বেসরকারি সিএসসিআরে একজন রোগী শনাক্ত হয়। নতুন করে পাওয়া এই ছয়জনসহ এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে সমকালকে নিশ্চিত করেছেন সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীরাও ঢাকা ফেরত বলে জানিয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সমকালকে বলেন, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত যত রোগী আমরা শনাক্ত করেছি, তার মধ্যে ৯৯ শতাংশই কোনো না কোনো কাজে ঢাকায় অবস্থানের সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। একজন রোগী পেয়েছি, যিনি কেবল নিজ এলাকা থেকে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন সবাই শঙ্কামুক্ত। বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেন, ঢাকায় ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি। তাই এ মুহূর্তে প্রয়োজন ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় না যাওয়া উচিত। ঢাকায় গেলে অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ডেঙ্গু রোধ করতে ড্রেনের চেয়ে বাসাবাড়ি, অফিস, মার্কেটে ওষুধ ছিটানোর ওপর জোর দিতে হবে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী বলেন, নগরবাসীকে ডেঙ্গু নিয়ে সতর্ক ও সচেতন করতে লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মাইকিংও করা হচ্ছে। সংবাদপত্রে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ সংশ্নিষ্টদের দেওয়া হচ্ছে নানা নির্দেশনাও।

করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী জানান, চট্টগ্রাম নগরে যাতে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করতে না পারে, সে জন্য ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় প্রতিটি ওয়ার্ডের ড্রেনগুলোতে ২৫ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড, ১০ হাজার লিটার লার্ভিসাইড ছিটানো হচ্ছে। ১৬১ কর্মী এ কাজে নিয়োজিত আছেন।

চমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা সুরেশ কুরী জানান, ঢাকায় বেড়াতে গিয়ে কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন তিনি। চট্টগ্রামে ফিরে এসে শরীরে জ্বর ও ব্যথা অনুভব করায় চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকরা তার শরীরে ডেঙ্গুর অস্তিত্ব খুঁজে পান। জ্বরের সঙ্গে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ব্যথা অনুভব করলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম।

এদিকে, ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ায় নানা আতঙ্কে রয়েছেন বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। তারা অভিযোগ করেছেন, সিটি করপোরেশন মশা নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালুর কথা বললেও এলাকায় এমন কাউকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাচ্ছে না।

হাটহাজারী উপজেলার পৌর প্রশাসক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমিন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে ফগার মেশিন দিয়ে স্প্রের পাশাপাশি নালা-নর্দমাও পরিস্কার করা হচ্ছে। তবে ওষুধ দিয়ে এ সমস্যা সম্পূর্ণ নিধন করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। বাসা ও অফিসের কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না।