রেলের সম্পত্তি: কালো থাবা-৮

পুকুরের সঙ্গে পাড়ও দখল

কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

কিশোরগঞ্জ অফিস

কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে বের হয়ে শহরের দিকে যাওয়ার পথেই চোখে পড়ত লেকসদৃশ পুকুরটি। দৃষ্টিনন্দন পুকুরটি এখন দখলদারদের থাবায় পড়েছে। পূর্ব ও পশ্চিমপাড়ের জমি দখল করে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। জমির পরিমাণ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময় পুকুরও ভরাট করা হচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনে এসব ঘটলেও কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনের ২ দশমিক ০৪ একর আয়তনের পুকুরটি ২০১৭ সালে মাছ চাষের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদে মাদারীপুরের কালকিনির সায়েম তালুকদার নামে এক ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়া হয়। ২ লাখ ৯৩ হাজার টাকায় পুকুরটি ইজারা নিয়ে অসুস্থতার অজুহাতে শর্ত ভঙ্গ করেন সায়েম তালুকদার। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী আবদুর রউফের ছেলে রাজিবুজ্জামান হিমেলের কাছে পুকুরটি  ছেড়ে দেন। এখন তার দখলেই আছে পুকুরটি।

স্থানীয়রা জানান, সরকারদলীয় শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম পুকুর সংলগ্ন রেললাইন অংশের পূর্বপাড়ে মাটি ভরাট করে প্রায় ১৫ শতাংশ জমি দখল করেছেন। তিনি সেখানে দোকানপাট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। তিনি ছাড়াও পুকুরপাড় ও রেলের জমিতে ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন তারাপাশা এলাকার খোকন মিয়া, আবদুল আজিজ, আলামিন, রফিক মিয়াসহ অন্তত ১০ জন। তাদের দাবি, তারা রেলওয়ের এস্টেট বিভাগ থেকে জায়গাগুলো ইজারা নিয়ে দোকান নির্মাণ করেছেন। এ জন্য তারা প্রতি বছর রেলওয়েকে নির্ধারিত হারে রাজস্ব দিচ্ছেন। তবে ওই রাজস্বের পরিমাণ জানতে চাইলে কেউ তা জানাতে পারেননি।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, রেলের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে নামমাত্র মূল্যে ইজারা নিয়ে পুকুর ও তার পাড়ের এসব ভূমি দখল করে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। রেলের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বছরে এক-দু'বার এখানে পরিদর্শনে আসেন। তবে অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে চলে যান তারা। এভাবে দখলদাররা দিনে দিনে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা পাড় ছাপিয়ে মূল পুকুরটি ভরাট করা শুরু করে দিয়েছে। এতে দিন দিন পুকুরটির আয়তন কমছে।

সরেজমিন পুকুরপাড় ঘুরে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি রেলের জমিতে থাকা একটি দোকান আরেকজনের কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকায় কিনেছেন। আরেক ব্যবসায়ী সেকান্দার আলী জানান, জমি ইজারা নিয়ে তিনি তিনটি দোকান ঘর তৈরি করেছেন। তিনটি দোকানই ভাড়া দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন মাস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন, স্টেশনের পুকুরটির পাশ দিয়ে হাঁটলেই দখলদারদের কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে। তখন খুব খারাপ লাগে। কিন্তু পুকুর দেখাশোনা করা তার শাখার কাজ নয়। তাই তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে চান না।

রেলওয়ের কাছ থেকে পুকুরটির ইজারা নেওয়া সায়েম তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে বর্তমান দখলদার রাজিবুজ্জামান হিমেল বলেন, তিনি মূল ইজারাদারের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে লিখে পুকুরটির দখল নিয়েছেন। সেখানে তিনি মাছ চাষ করছেন। তার দাবি, তিনি দখলে না নিলে প্রভাবশালীরা এতদিনে পুকুরটি ভরাট করে ফেলত। তিনি অভিযোগ করেন, প্রভাবশালীরা ভরাট করায় তিন একরের পুকুর ইতিমধ্যে দুই একরে দাঁড়িয়েছে।

রেলের পূর্বাঞ্চল এস্টেট বিভাগের সার্ভেয়ার ফয়েজ মিয়া বলেন, দোকানপাট তৈরির কারণে বিশাল পুকুরটি এখন দেখাই যায় না। দোকান নির্মাণের জন্য পুকুরপাড়ের জমি ইজারা দেওয়া হয়নি। পুকুরের পূর্ব-পশ্চিম এলাকার জমিও ইজারা দেওয়া হয়নি। সেখানে নির্মিত সব স্থাপনাই অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।

রেলস্টেশন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও উপ-সচিব তরফদার মো. আক্তার জামীল এ বিষয়ে বলেন, রেলের হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি অপরিকল্পিত ও অপরিণামদর্শী ইজারার কারণে দখলদারদের হাতে চলে গেছে। দৃষ্টিনন্দন পুকুরটি মেরে ফেলা হচ্ছে। এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমি ইজারা বা বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করা হলে এমনটি হতো না।