পরীক্ষা হয়, ফল হয় না

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯      

স্বপন কুমার মল্লিক, চট্টগ্রাম

২০১৬ সালে চট্টগ্রাম নগরীর বিবিরহাটে শুরু হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) 'আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার' বা 'ফুড সেফটি ল্যাব'। প্রতি মাসেই বাজার থেকে সংগৃহীত ১৫টি খাদ্যপণ্যের পরীক্ষা করা হয় এই ল্যাবে। কিন্তু সেই পরীক্ষার ফল হয় না কখনোই। শুধু পরীক্ষা করেই চলছে তিন বছর ধরে। সাইনিং অথরিটি না থাকায় টেস্টের পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ফুড সেফটি ল্যাবের সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। আবার একই কারণে অন্যদিকে বছরে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিতও হচ্ছে চসিক।

এ প্রসঙ্গে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা বলেন, 'মূলত জনবল সংকটের কারণেই আমাদের এই সমস্যা হচ্ছে। সাইনিং অথরিটি নিয়োগ দিতে না পারায় শুধু পরীক্ষা করেই বসে থাকতে হচ্ছে আমাদের। সমস্যা সমাধানে আমরা অর্গানোগ্রামের অনুমোদন চেয়েছি অনেক আগেই। সেটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আলোচনা সাপেক্ষে ইতিমধ্যে ১৬টি পদের অনুমোদন দিয়েছে। অবশিষ্ট পদগুলো বা জায়গাগুলোতে অনুমোদন পেলেই ল্যাবে পরীক্ষার ফল দিতে পারার সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ হবে ল্যাবটি। আমরা চেষ্টা করছি অতি কম সময়ে বাকি প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে। তাহলেই চট্টগ্রামবাসী এ ল্যাবটির শতভাগ সুফল পাবেন। পাশাপাশি আমরাও বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আদায় করতে পারব।'

চসিক সূত্র জানায়, ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আরবান পাবলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট হেলথ সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (ইউপিইএইচএসডিপি) আওতায় এ খাদ্য পরীক্ষাগারটি নির্মাণ করা হয়। জনবল কাঠামো অনুমোদন না পাওয়ায় পরীক্ষামূলক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল এই পরীক্ষাগারটি। গত ৭ মার্চ ১৬টি পদের জনবল কাঠামো অনুমোদন দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়। জনবল নিয়োগের অর্গানোগ্রাম মন্ত্রণালয় অনুমোদন না করায় গত তিন বছর ধরে পরীক্ষামূলকভাবে চলে আসছে ল্যাবটি। এরপর গত ১৫ জানুয়ারি ৩৪টি পদ সৃজন সংক্রান্ত বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর খাদ্যের ভেজাল শনাক্ত ও গুণাগুণ নির্ণয়ে বেশ কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় ৮২টি যন্ত্রপাতি। ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ল্যাবটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল ল্যাবটিতে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর 'মান রক্ষা করা, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন ও তার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা'- এই তিন শর্তে পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ল্যাবে সিটি করপোরেশনের খাদ্য পরিদর্শকদের মাধ্যমে সংগৃহীত খাদ্যপণ্য ও খাবার পানিসহ বিভিন্ন পানীয় পরীক্ষামূলক টেস্ট করা হচ্ছে। তবে কোনো সাইনিং অথরিটি না থাকায় টেস্টের পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী বলেন, 'পর্যাপ্ত জনবল সংকটের কারণে খাদ্য পরীক্ষারগারটি আলোর মুখ দেখছিল না। এখন সে সমস্যা কেটে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই এ সংক্রান্ত নিয়োগ অনুমোদন মন্ত্রণালয়ের টেবিলে রয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপগুলো শেষ হলেই জনবল কাঠামো নিয়োগ হবে। ফলে পুরোদমে কাজ করতে পারবে খাদ্য পরীক্ষাগারটি। একই সঙ্গে ল্যাবটি নগরীর জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।'

এদিকে পুরোপুরি চালু হলে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও অবদান রাখতে পারবে পরীক্ষাগারটি। চট্টগ্রাম নগরীতে যতগুলো হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোকে সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু কোনো ল্যাব না থাকায় তাদের মান যাচাই করার সুযোগ সিটি করপোরেশনের নেই। ল্যাবটি কাজ শুরু করতে পারলে এবং সিটি করপোরেশন চাইলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য নমুনা ও মান পরীক্ষাপূর্বক লাইসেন্স দিতে পারবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে অনেক খাদ্য রফতানি ও চট্টগ্রামে অনেক খাদ্য আমদানি হয়। সেগুলোর মানও যাচাই করতে পারবে চসিকের বহুপ্রতীক্ষিত আধুনিক এই খাদ্য পরীক্ষাগার বা 'ফুড সেফটি ল্যাব'টি।