আনছারুলের স্মৃতি আঁকড়ে পরিবার

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯      

মোতাহার আলম চৌধুরী মদন (নেত্রকোনা)

ছেলে আনছারুল হককে হারিয়েছেন তিন বছর। এখনও কান্না থামেনি মা রাবেয়া খাতুনের। পুত্রশোকে কাটে নির্ঘুম রাত। ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন তিনি। রাবেয়া বলেন, 'পুত আমারে বলছিল, মা আমি ঈদের নামাজ পড়েই বাড়ি আইব। আমার পুত আসল লাশ হয়ে।'

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ২০১৬ সালের ৭ জুলাই রোজার ঈদের দিন জঙ্গি হামলায় নিহত হন পুলিশ কনস্টেবল আনছারুল হক (২৭)।

তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার মদন উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে।

গতকাল শনিবার দৌলতপুর গ্রামে কথা হয় আনছারুলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। রাবেয়া জানান, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৭টায় মায়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলেন আনছারুল। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফিরবেন বলে জানান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। পরিবারের সঙ্গে আর ঈদ উদযাপন করা হয়নি তার। তিনি বাড়ি ফেরেন লাশ হয়ে। শুধু মা রাবেয়া নন, পুরো পরিবার এখন বেঁচে আছে আনছারুলের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে।

আনছারুলের ছোট ভাই আইনুল হক জানান, দিনটি উপলক্ষে আজ রোববার গ্রামের বাড়িতে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সবাইকে এতে অংশ নেওয়ার এবং ভাইয়ের রুহের মাগফিরাত কামনার অনুরোধ জানান তিনি।

পুত্রশোকে কাতর রাবেয়া বলেন, 'তিন বছর হয়ে গেল, এখনও চোখের পাতা এক করতে পারি না। আমার পুত এক মাস রোজা রাখছিল। বলছিল ঈদের ছুটি হয়েছে মা, মাঠের ডিউটির পর আসব। এসে তোমার সাথেই খাইব। খাওয়া আর হলো না।'

রাবেয়া জানান, আনছারুলই ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের হাল ধরেছিলেন তিনি। ছেলের মৃত্যুর পর ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল রাবেয়ার। তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীরে আমি বলতে হারি নাই আমার আর একটা পুত আছে, তার যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরির ব্যবস্থা করলে এই পরিবারটি বাইছে যাইত। আমার পুতে হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাইছে। প্রধানমন্ত্রী আমার এই হোলারে একটা চাকরি দিয়ে কয়েকজনের জীবন বাঁচাক।'

রাবেয়া জানান, ছোট ছেলে আইনুলকে নিয়ে চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন তিনি। অবশেষে পুলিশ সুপার আউটসোর্সিংয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে ১২ হাজার টাকা বেতনে আইনুলের একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু ওই টাকায় তাদের সংসার চলে না। তিনি বলেন, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি চাই। তিন বছর হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত খুনিদের বিচার হলো না।

দাম্পত্য জীবনে নিঃসন্তান ছিলেন আনছারুল। তার স্ত্রী নূরন্নাহার এখন শ্বশুরবাড়িতে থাকেন না। মোবাইল ফোনে আনছারুলের বিষয়ে জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, সংসার জীবনে কখনও ঝগড়া হয়নি। আনসারুলকে কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে দেখেননি।