নুসরাত হত্যা

কঠিন পরীক্ষায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০১৯

জাহিদুর রহমান, ফেনী থেকে ফিরে

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে একাধিক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে এক নেতা গ্রেফতারও হয়েছেন। আসামিদের জবানবন্দিতে ঘটনার আগে ও পরে দলের উপজেলা সভাপতি রুহুল আমিনের সংশ্নিষ্টতার কথাও উঠে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে সারাদেশে চলছে সমালোচনা। অন্যদিকে, নেতাদের ভূমিকায় দলের তৃণমূলের কর্মীরাও দেখাচ্ছেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। দলের স্থানীয় পর্যায়ের পুনর্গঠন চাইছেন তারা। এ অবস্থায় কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে সোনাগাজীসহ ফেনী আওয়ামী লীগ।

দলের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা বলছেন, দলীয় কোন্দল, অযোগ্য নেতাদের পদ দেওয়া, হাইব্রিড নেতাদের আধিপত্য, অনুপ্রবেশ, অর্থের লোভ, ক্ষমতার দাপটসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত সোনাগাজী আওয়ামী লীগ। ক্ষমতার সুবিধা নিতে বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। যারা বিশ্বস্ততার সঙ্গে সাংগঠনিক তৎপরতায় যুক্ত, তাদের মূল্যায়ন না করে অযোগ্য এবং অনুপ্রবেশকারীদের দলে স্থান দেওয়ায় নুসরাত হত্যার মতো নির্মম ঘটনায় আওয়ামী লীগের বিশাল ক্ষতি হয়েছে। জামায়াত নেতা সিরাজ-উদ-দৌলা স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতেন। তাই অভিযোগের অঙ্গুলি উঠেছে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের দিকে। দলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ের কয়েক নেতার অপকর্মের প্রভাব পড়েছে সারাদেশে। দলের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পোষানো যাবে না। এ ধাক্কা সামলে উঠতে হলে প্রথমেই স্থানীয় আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করতে হবে।

এ অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার ফেনী শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহমান বিকমের সভাপতিত্বে সভায় অংশ নেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলা উদ্দিন, ফেনীর সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীসহ জেলা, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌর ও শহর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। প্রায় তিন ঘণ্টার এ সভায় নেতাকর্মীরা নুসরাত হত্যার ঘটনায় দলীয় নেতাদের সম্পৃক্ততায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নেতারা কর্মীদের শান্ত থাকতে বলেন। তারা জানান, অপকর্মে জড়িত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যেভাবে রুহুল আমিনের উত্থান :সরেজমিন অনুসন্ধানে ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোনাগাজীর নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে চরছান্দিয়া ইউনিয়নে বিএনপি-জামায়াতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের বাড়ি। তার বাবা কোরবান আলী সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। ১৯৯৪ সালে বিএনপির প্রবল প্রতাপের মধ্যেই রুহুল আমিন স্থানীয় আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন। ১৯৯৭ সালে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে পূর্ণমাত্রায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলে রুহুল আমিন ঢাকা চলে যান এবং পরে সৌদি আরবে অবস্থান করেন। ২০০৬ সালে তিনি দেশে ফিরে স্থানীয় আওয়ামী লীগে নতুন করে সক্রিয় হন। ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনে তিনি ফেনী-৩ আসনে মহাজোট প্রার্থী আবুল বাসারের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনে আবুল বাসার বিএনপি প্রার্থী মোশারফ হোসেনের কাছে পরাজিত হন।

এর পর থেকে রুহুল আমিন কখনও সোনাগাজী, কখনও ঢাকায় অবস্থান করে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। ২০১৩ সালে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মনোনীত হন। একই বছর তিনি সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে ৪৪ নম্বর সদস্য হিসেবে স্থান পান।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা হাজি রহিম উল্যাহ। তিনি কয়েক মাস জেলা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলেও পরে উন্নয়নকাজের কমিশনের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব-বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। সোনাগাজীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও রহিম উল্যাহ গ্রুপ ও ফেনী সদরের সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এ সময় রুহুল নিজাম হাজারীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে রহিম উল্যাহকে কোণঠাসা করে ফেলেন। উভয় গ্রুপে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

রুহুল আমিনের পদপদবি নিয়ে বিভ্রাট :চলতি বছরের জানুয়ারিতে সোনাগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান পদে জেলা আওয়ামী লীগ রুহুল আমিনের নাম ঘোষণা করে। একই সময় এ পদে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপনকে মনোনয়ন দেয়। এ সময় রুহুল আমিনের দলীয় পদবি নিয়েও বিভ্রান্তি ছিল। কারণ, রুহুল আমিন নিজেকে সভাপতি দাবি করলেও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদক স্বাক্ষরিত উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে সভাপতি হিসেবে ফয়েজুল কবিরের নাম রয়েছে। একই কমিটিতে নিজেকে সভাপতি দাবি করা রুহুল আমিনের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সহসভাপতি হিসেবে।

নেতাকর্মীরা বলছেন, জেলা কমিটি রুহুল আমিনকে সভাপতি ঘোষণা করলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি। আবার আগের সভাপতি ফয়েজুল কবিরকে অব্যাহতি না দেওয়ায় তিনি এখনও নিজেকে সভাপতি বলে দাবি করে আসছেন। তবে জেলার প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দে পকেট কমিটি নিয়ে ইচ্ছামতো দল চালাচ্ছেন রুহুল আমিন।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে সহসভাপতি হিসেবে রহিম উল্যাহর নাম ফ্লুইড দিয়ে মুছে সেখানে রুহুল আমিনের নাম বসিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ কমিটিকে অনুমোদন করে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সমর্থন না পেয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি ফয়েজুল কবির চট্টগ্রাম গিয়ে নিজের ব্যবসায় মনোযোগী হন। তার অনুপস্থিতিতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী রুহুল আমিনকে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ঘোষণা করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির অধিকাংশ সদস্যের অভিযোগ, দলীয় সভা না করে নির্বাচিত সভাপতি থাকা অবস্থায় নিজাম হাজারীর একক সিদ্ধান্তে রুহুল আমিনকে এই পদে যুক্ত করা হয়। পরে সাত-আট মাস আগে নিজাম হাজারী সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে রুহুল আমিনের নাম ঘোষণা করেন।

আওয়ামী লীগ নেতা ফয়েজুল কবির বলেন, ২৮ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। ২০১৩ সালে দলীয় কাউন্সিলে তৃণমূলের গোপন ভোটে সাবেক এমপি রহিম উল্যাহকে তিন ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছি। দল থেকে পদত্যাগ করিনি। এমনকি দল থেকে আমাকে বহিস্কারও করা হয়নি। রুহুল আমিন কীভাবে সভাপতি হয়েছেন, তা জানি না।

এ প্রসঙ্গে রুহুল আমিন বলেন, তাকে কীভাবে উপজেলা শাখার সভাপতি করা হয়েছে- তা জেলা আওয়ামী লীগই ভালো বলতে পারবে। এ সম্পর্কে জানতে তাদের কাছেই খবর নিতে বলেন তিনি।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহমান বিকম বলেন, ফয়েজুল কবির ভোটের মাধ্যমে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে তিনি চট্টগ্রাম চলে যান। তারপর তিনি দু-তিন বছর এলাকায় ছিলেন না। তখন রুহুল আমিনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। ছয়-সাত মাস আগে দলের বর্ধিত সভায় রুহুল আমিনকে সভাপতি করা হয়।

দু'জনের দাপটে নিষ্ফ্ক্রিয় ত্যাগীরা :২০১৫ সালে সংসদ সদস্য রহিম উল্যাহর সঙ্গে বিরোধ শুরু হওয়ার পর রুহুল আমিন সদরের সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর প্রকাশ্য সমর্থনে সোনাগাজী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এ সময় থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রুহুল আমিন ও সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকনের হাতে। বিভিন্ন সময় এ দু'জনের মধ্যে কমিশনের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ হলেও নিজাম হাজারীর হস্তক্ষেপে তা মিটে যায়। ফলে দু'জনের সম্মিলিত দাপটে দলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং হামলা-মামলার শিকার হয়ে নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে যান। একই সময়ে দলের মধ্যে এ দু'জনের সমর্থনে হাইব্রিড নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। তাদের দু'জনের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতকে পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগও রয়েছে। জেলা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণকারী নিজাম হাজারীর কাছে গিয়েও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এসব সমস্যার কোনো সমাধান পাননি। নব্য আওয়ামী লীগার ও হাইব্রিড নেতাকর্মীদের কারণে তাই দলের ভাবমূর্তি ক্রমে ক্ষুণ্ণ হতে থাকে।

আওয়ামী লীগ নেতা ফয়েজুল কবির বলেন, 'অযোগ্য লোকদের কারণে আজ আওয়ামী লীগের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। নুসরাতের ঘটনায় যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের সবার গডফাদার রুহুল আমিন। তার পৃষ্ঠপোষক কারা, তাও সবাই জানে।'