তরিকুলের হামলাকারীরা প্রকাশ্যে, মামলার ভয়

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৮      

সৌরভ হাবিব ও মুস্তাফিজ রনি, রাজশাহী

তরিকুলের হামলাকারীরা প্রকাশ্যে, মামলার ভয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিসোটা নিয়ে এভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা - ফাইল ছবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলা চালানো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্যাম্পাসে। নিয়মিত অংশ নিচ্ছে সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও। এক শিক্ষার্থীকে হাতুড়ি, রামদা ও বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে পা ভেঙে দেওয়ার ঘটনার পর কোনো শাস্তিরই সম্মুখীন হয়নি তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। তবে ছাত্রলীগ বলছে, শিবির-ছাত্রদলকে প্রতিহত করেছে নেতাকর্মীরা। তাই কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তারা ভাবছে না।

আহত তরিকুলের পরিবারের লোকজনকেও চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে তারা মামলা করতেও ভয় পাচ্ছেন। বাবা নিজ এলাকায় হেনস্তার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তরিকুলের ছোট বোন ফাতেমা খাতুন। তরিকুলের বন্ধুদের অভিযোগ, 'চাপে পড়ে' রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সুস্থ হওয়ার আগেই তাকে ছাড়পত্র দিয়েছে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি হয়েছে।

২ জুলাই তরিকুলের ওপর হাতুড়ি দিয়ে আক্রমণ করা আবদুল্লাহ আল মামুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। তার বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলায়। বর্তমানে তার আবাসিক হল নওয়াব আবদুল লতিফ হলেই অবস্থান করছেন। প্রকাশ্যে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে তার ফেসবুক আইডি বর্তমানে বন্ধ আছে। রামদা দিয়ে আঘাত করা ছাত্রলীগকর্মী লতিফুল কবির মানিক ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি লালমনিরহাট জেলায়। তিনি বর্তমানে তার আবাসিক হল শেরেবাংলা হলেই অবস্থান করছেন এবং ক্যাম্পাসেও ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে বুধ ও বৃহস্পতিবার ক্লাসে যাননি। তিনিও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে রেখেছেন।

এ ছাড়াও ১ ও ২ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণকারীদের মধ্যে ছাত্রলীগ সহসভাপতি মিজানুর রহমান সিনহা, সাদ্দাম হোসেন, রমিজুল ইসলাম রিমু, আহমেদ সজীব, সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান লাবন, মেহেদী হাসান মিশু প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন ক্যাম্পাসে। তারা ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও অংশ নিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন আগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হলেও পরে শিবির ও ছাত্রদল এটিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা তাদের প্রতিহত করেছি। তারা আমাদের ওপর হামলা করার চেষ্টা করেছিল বলেই নেতাকর্মীরা তাদের প্রতিহত করেছে। আমাদের কর্মীদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। ওরা (আন্দোলনকারীরা) যে বাঁশ, লাঠি দিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, আমরা

ওদের কাছে থেকে ওগুলো কেড়ে নিয়ে ওদের প্রতিহত করেছি। হাতুড়ি এবং রামদা বহনকারীদের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো জবাব দেননি।

ছাত্রলীগের ওইসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি-না জানতে চাইলে বলেন, 'তারা শিবির ও ছাত্রদলের দুস্কৃতকারীদের প্রতিহত করেছে। তাই তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থার কথা ভাবছি না।'

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, যেহেতু ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ঘটেছে তাই এটি পুলিশ প্রশাসনই দেখবে। আর যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে কোনো অভিযোগ আসে তবে সেটা দেখা যাবে।

তরিকুলের পাশে থাকা বন্ধুদের একজন মতিউর রহমান জানান, হঠাৎ বৃহস্পতিবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তরিকুলকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরে তাকে নগরীর আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে হঠাৎ তার ব্যথা বেড়ে গেছে। পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় একদম নাড়াতে পারছে না। ডাক্তার সাতটি টেস্ট করতে দিয়েছে। এসবের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে অপারেশনের জন্য সিদ্ধান্ত হবে। তবে ডাক্তার তরিকুলের পায়ের এক্সরে রিপোর্ট দেখে দ্রুত অপারেশন করার কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, 'তরিকুলের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও বাবাকে এলাকায় হেনস্তা করা হচ্ছে- এমন কথা শুনে সে ভাঙ্গা গলায় বড় ভাই তৌহিদুল ইসলামকে দ্রুত বাড়ি গিয়ে বাবার কাছে থাকতে বলেছে। এরপর তিনি গাইবান্ধার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।

তরিকুলের বোন ফাতেমা খাতুন বলেন, 'ভাইয়ের অবস্থা, বাবার হেনস্তা সব মিলিয়ে ভয়ের মধ্যে আছি আমরা। ভাই সুস্থ হলে মামলাসহ অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।' তবে তিনি হামলাকারীদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানান।

পুলিশের সামনেই তরিকুলকে মারধরের ঘটনা ঘটলেও ঘটনাস্থল থেকে কেউ গ্রেফতার হয়নি। মতিহার থানার ওসি শাহাদাত হোসেন বলেন, 'পুলিশও আইনের বাইরে নয়। তাই মামলা না হলে কাউকে গ্রেফতার করতে পারি না। মামলা করলে তখন দেখা যাবে।'

'চাপে পড়ে' ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যাপারে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রি. জে. জামিলুর রহমান গতকাল সমকালকে বলেন, চাপের প্রশ্নই ওঠে না। ছেড়ে দেওয়ার মতো মনে করেছেন বিধায় ডাক্তাররা তরিকুলকে ছেড়ে দিয়েছেন।