যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ তুঙ্গে

বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৮      

রাশেদ মেহেদী

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। বাংলাদেশের বাজারে প্রযুক্তি পণ্য সরবরাহকারী দুটি বড় চীনা কোম্পানির মধ্যে একটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। ওই কোম্পানি বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে পারছে না। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের দুটি বড় প্রকল্পে যন্ত্রপাতি সরবরাহ বন্ধ থাকায় ওই দুটি প্রকল্পের কাজ কার্যত স্থগিত।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে, চীনের একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কারণে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে চীনের অন্য একটি কোম্পানি। বিভিন্ন প্রকল্পে দরপত্র ছাড়া একক চুক্তির মাধ্যমে প্রযুক্তি যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ নিয়ে অনেক বেশি দামে পণ্য কিনতে বাংলাদেশকে বাধ্য করছে তারা। অবশ্য অভিযোগটি নাকচ করে দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও নীতিমালা অনুসরণ করে প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়। দাম নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট দপ্তরের কমিটি দর কষাকষি করে। এ কারণে এককভাবে কোনো কোম্পানির বাড়তি সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই।

গত ১৫ এপ্রিল চীনের বড় প্রযুক্তি পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেডটিই করপোরেশনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিটিসিএলের প্রায় আড়াই

হাজার কোটি টাকার এমওটিএন প্রকল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি

বিভাগের প্রায় এগারশ' কোটি টাকার ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার প্রকল্প এককভাবে বাস্তবায়ন করছে চীনের জেডটিই করপোরেশন। এ দুটি প্রকল্পেই সব ধরনের মৌলিক কম্পিউটিং যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার কথা জেডটিইর। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কোম্পানির কাছ থেকে এসব কম্পিউটিং যন্ত্রপাতি আমদানি করত জিডটিই। নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির কাছ থেকে সেসব যন্ত্রপাতি সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে। ফলে দুটি প্রকল্পের কাজই কার্যত স্থগিত।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, এমওটিএন প্রকল্পে যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ শুরুর আগেই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে জেডটিই। ফলে এ প্রকল্প শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে। এ প্রকল্প গ্রহণের শুরু থেকেই অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর অভিযোগ ওঠে এবং ব্যয় পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের শর্ত রেখে একনেকে এটি অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে ফোর টায়ার ডাটা সেন্টারের কাজ আরও প্রায় তিন বছর আগে শুরু হলেও এখন পর্যন্ত তা শেষ হয়নি। জেডটিই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় এ প্রকল্পের কাজ কবে শেষ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রকল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এখনও স্থাপন করা হয়নি। এসব যন্ত্রপাতি জেডটিই সরবরাহ করতে পারবে কি-না তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

চীনের আরেক কোম্পানি বাড়তি সুবিধা নিচ্ছে :জেডটিই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় চীনের অন্য বৃহৎ কোম্পানি হুয়াওয়ে দেশের প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি সরবরাহে অনেকটাই একচেটিয়া সুবিধা নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুই দশক আগ পর্যন্ত দেশে ইউরোপ ও আমেরিকার কোম্পানি এরিকসন, সিমেন্স, অ্যালকাটেল, সিয়েনা তথ্যপ্রযুক্তি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করত। জাপান ও কোরিয়ার কিছু কোম্পানিও এ কাজে যুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে এবং জেডটিই দেশের বাজারে আসার পর অপেক্ষাকৃত কম দামে যন্ত্রপাতি সরবরাহের সুবিধা দিয়ে বাজারে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। ২০১২ সালের পর থেকে হুয়াওয়ে ও জেডটিই বাংলাদেশের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ প্রকল্পে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে আসছিল চীনের এ দুটি কোম্পানি।

কিন্তু বর্তমানে জেডটিই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় হুয়াওয়ে একাধিক প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাব দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত এপ্রিলে বেসরকারি কোম্পানির একটি প্রকল্পে হুয়াওয়ে যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্যয় প্রস্তাব করে। পরে দেখা যায়, এসব যন্ত্রপাতির বাজার মূল্য ১৫ কোটি টাকা। পরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১৪ কোটি টাকায় একই ধরনের যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাব করে।

গত জুন মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ কোম্পানির একটি প্রকল্পে হুয়াওয়ে ফোরজি প্রযুক্তি হালনাগাদ করার জন্য একটি অংশে প্রায় ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় প্রস্তাব দেয়। অথচ প্রকল্পের অন্য অংশের জন্য ইউরোপীয় কোম্পানি নকিয়া নেটওয়ার্ক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রস্তাব দেয়। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির বোর্ড সভায় আলোচনা হলে হুয়াওয়ে পরে ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে ব্যয় নামিয়ে আনে। সর্বশেষ হুয়াওয়ে ১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং নকিয়া নেটওয়ার্ক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে ব্যয় নামিয়ে এনেছে। সূত্র জানায়, ব্যয় আরও কিছু কমানোর জন্য এখনও দর কষাকষি চলছে।