উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বড় বন্যার পদধ্বনি

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৮      

সমকাল ডেস্ক

উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ধেয়ে আসছে বন্যা। বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে বাড়ছে এসব এলাকার নদনদীর পানি। এরই মধ্যে তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এসব নদী অববাহিকার রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও মৎস্য খামার। পানি উঠে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের ছাতকে অন্তত ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

সমকালের ব্যুরো, অফিস ও জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

রংপুর : উজানের পাহাড়ি ঢলে বৃহস্পতিবার রাত থেকে তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার এবং শুক্রবার বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী, বাগডোহরা, মীনাবাজার, কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনার চর, মটুকপুর, চিলাখাল, লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চর শংকরদহ, জয়রাম ওঝা, চর ইচলী, গজঘণ্টার ছালাপাক, রমাকান্ত, মর্নেয়া ইউনিয়নের ছোট রুপাই, রামদেব, কামদেব, আলমবিদিতরের হাজীপাড়া, ব্যাংকপাড়ার প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া নদী ভাঙনের কারণে নতুন করে কোলকোন্দ, লক্ষ্মীটারীর প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি সরিয়ে রাস্তায় নিয়ে আসা হয়েছে। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন এসব এলাকার মানুষ। এরই মধ্যে শংকরদহ বিদ্যালয়ের পাশের মসজিদটি তিস্তায়

বিলীন হয়ে গেছে। সাউদপাড়া মাদ্রাসায় যাওয়ার রাস্তা, আনন্দলোক বিদ্যালয় সংযোগ সড়ক, শংকরদহ চরের সংযোগ সড়কে জোড়া ব্রিজ, মহিপুর-কাকিনা সড়কের শংকরদহ স্কুলের পাশে ব্রিজের সংযোগ সড়ক পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। শংকরদহের আশ্রয়ণ প্রকল্পের চারপাশে পানি উঠে গেছে। যেকোনো সময় প্রকল্প এলাকায় পানি ঢুকে যাবে বলে জানান এলাকাবাসী। এ ছাড়া তিস্তার পানির প্রবল স্রোতে মহিপুর থেকে লালমনিরহাট যাওয়ার ৪৮ মিটার ব্রিজের সংযোগ সড়ক ভাঙতে শুরু করেছে। এলাকাবাসী সড়ক টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন।

গতকাল দুপুরে নদী ভাঙন ও পানিবন্দি এলাকা পরিদর্শন করেছেন গঙ্গাচড়ার সংসদ সদস্য, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা। জেলা প্রশাসক এনামুল হাবীব বলেন, লক্ষ্মীটারী ও কোলকোন্দর কিছু এলাকায় মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি আছে। পানি আরও বাড়লে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

কুড়িগ্রাম :কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ

১৬ নদ-নদীতে পানি বাড়ছে। ধরলার পানি বেড়ে গতকাল সকালে বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর ফলে সদর, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় চার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ধরলার ফেরিঘাট পয়েন্টে ৪৬ সেন্টিমিটার, তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ৩২ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।

জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন জানান, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো কাজ শুরু করেছে।

লালমনিরহাট : হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী এলাকায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে গতকাল সকাল ৬টায় পানি বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় দহগ্রামের চর, হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, ধুবনী, সির্ন্দুনা, ডাউয়াবাড়ী, কালিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম কাশিরাম, চর বৈরাতী, নোহালী চর, শৈলমারী চর, ভোটমারী চর, হাজিরহাট চর, আমিনগঞ্জ চর, কাঞ্চনশ্বর চর ও রুদ্ধেশ্বর চর, আদিতমারী উপজেলার চন্ডিমারী, দক্ষিণ বালাপাড়া, ছালপাক, চরগোবর্ধন, লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটি, খুনিয়াগাছা, রাজপুর, তিস্তা, গোকুণ্ডা, মোগলহাটসহ তিস্তা-ধরলা নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে এসব এলাকার আমন বীজতলাসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষেত। মানুষজন গবাদি পশু নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে।

ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) :ব্রহ্মপুত্র নদের পানি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার চর এলাকার লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। শত শত একর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের উত্তর উড়িয়া, রতনপুর, গজারিয়া ইউনিয়নের কাতলামারী, জিয়াডাঙ্গা, ফুলছড়ি ইউনিয়নের দেলুয়াবাড়ী, ফজলুপুর ইউনিয়নের পূর্ব খাটিয়ামারী, উজালডাঙ্গা, এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের জিগাবাড়ী, সন্ন্যাসীর চরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।

সুনামগঞ্জ :জেলার বিভিন্ন এলাকার ৫০৫ হেক্টর আউশ জমি, ৬০ হেক্টর সবজি ক্ষেত ও ৩১ হেক্টর আমন বীজতলা তলিয়ে গেছে। গতকাল পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের কিছু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়েছে। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়ক ডুবে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

ছাতক উপজেলার ইসলামপুর, নোয়ারাই, দক্ষিণ খুরমা, চরমহলা, কালারুকাসহ কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।পানি ঢুকে পড়ায় অন্তত ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উপজেলার তাহসিন তানিসা বহুমুখী এগ্রো ফিশারিজসহ ৫টি মৎস্য খামার তলিয়ে গিয়ে কয়েক লাখ টাকার পোনা মাছ বেরিয়ে গেছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নিগার সুলতানা কেয়া জানান, সুরমার পানি বাড়ায় পৌর শহরের নবীনগর, তেঘরিয়া, উত্তর আরপিননগর, বড়পাড়া, জলিলপুর এলাকার কিছু অংশ প্লাবিত হয়েছে।

দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক জানান, বিভিন্ন এলাকার অনেক আউশ জমি, আমন বীজতলা ও সবজিক্ষেত তলিয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় নদীর পানি তেমন বাড়েনি। আগে হাওরে পর্যাপ্ত পানি ছিল না, এখন নদীর পানি বেড়ে হাওরে পানি ঢুকছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

সিলেট :গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জসহ কয়েকটি উপজেলায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, নদীর পানি বিভিন্ন স্থানে বেড়েছে। হাওরেও পানি বাড়ছে। তবে বৃষ্টিপাত কমলে পানিও কমে আসবে।