রোহিঙ্গা শিবিরে জন্ম নিচ্ছে 'অনাকাঙ্ক্ষিত' শিশু

ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বাদের দুর্বিষহ জীবন

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৮      

সমকাল ডেস্ক

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যদের পৈশাচিক ধর্ষণ, গণধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের কোলে আসছে 'অনাকাঙ্ক্ষিত' সন্তান। নির্যাতন-নিপীড়নে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসার সময় যন্ত্রণার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নিজেদের শরীরে বহন করে আনা 'অনাগত' জীবনগুলো ভূমিষ্ঠ হচ্ছে গোপনে। প্রসববেদনা আড়াল করতে কেউ কেউ মুখে কাপড় কামড়ে রাখছে। তবে জীবনের আগমনধ্বনি তো আটকে রাখা যায় না। পলিথিনের বেড়ার ছোট ছোট ঘর থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে ভূমিষ্ঠ শিশুর প্রথম কান্নার আওয়াজ। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে 'অপ্রত্যাশিত' নবজাতক নিয়ে মর্মান্তিক জীবন কাটাচ্ছেন এমন নারীরা।

সীমান্ত চেকপোস্টে হামলার অভিযোগে গত বছর মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নির্যাতনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরের মাসে জাতিসংঘের সহিংসতা ও যৌন নিপীড়ন অনুসন্ধানী দল রোহিঙ্গা নারীদের সেনাদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার প্রমাণ দেয়। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, মিয়ানমার থেকে তাড়ানোর পরিকল্পনা হিসেবে রোহিঙ্গা নারীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গণধর্ষণ করে সেনারা। এখন সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর মাশুল দিতে হচ্ছে অবিবাহিত কিশোরী-তরুণী রোহিঙ্গাদের। কোলজুড়ে আসা নবজাতকরাই তাদের মায়েদের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হচ্ছে। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব ধর্ষিত নারী গর্ভবতী হয়েছেন, তারা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আতঙ্কিত জীবন কাটাচ্ছেন। এমন এক অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী ১৩ বছর বয়সী 'আ' (নামের প্রথম অক্ষর) সেনা ধর্ষণের শিকার। পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে সে নিজের শরীরে অনুভব করে আরেক প্রাণের অস্তিত্ব। পরিস্থিতিকে 'কারাগার'তুল্য মনে হতে থাকে তার। সমাজে ধর্ষিতার পরিচয়, বিয়ে-বহির্ভূত সন্তান প্রসব তার ভবিষ্যৎকে দিশাহীন করবে- তাই গর্ভের সন্তানকে অগোচরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করে সে।

আরেক ভুক্তভোগী নারী 'ম' (নামের প্রথম অক্ষর)। মিয়ানমার সেনাদের ধর্ষণের শিকার ওই নারী এখন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে আছেন। এপির সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে দেখেন 'ম' একটি মাদুরের ওপর বসে আছেন। ধর্ষণের কারণে ভূমিষ্ঠ হওয়া তার নবজাতককে কোলে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে আট বছরের বোন। বাচ্চাটিকে মায়ের কাছে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। তবে হাত তুলে 'ম' জানিয়ে দিলেন তাকে কোলে নেবেন না। 'আমি আর তাকে বয়ে বেড়াতে চাই না। আমি ওকে ভালোবাসি না।'

আগের দু'জনের মতো আরেক রোহিঙ্গা নারী 'দ'। ধর্ষণের পর শরীরে ভীষণ যন্ত্রণা নিয়ে কোনো রকমে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। একদিন বুঝতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীহারা বিধবা নারী যদি সন্তান জন্ম দেন, তবে সমাজে তার কী পরিণতি হবে, তা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। কলঙ্কমুক্ত হতে তিনি গর্ভপাতের বড়ি খান। তিনি

জানান, তার জীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের মতো শিশুবিষয়ক সংস্থাগুলো পরিত্যক্ত রোহিঙ্গা শিশুদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছে। রোহিঙ্গা শিবিরের অন্য কোনো পরিবার আগ্রহী হলে তাদের কাছে সে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে। 'অ' জানান তার মেয়ে হওয়ার এক ঘণ্টা পরই এক সহায়তাকর্মীর কাছে তাকে তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্য কারও আশ্রয়ে আছে সে। 'অ' স্বপ্ন দেখেন একদিন কেউ না কেউ তাকে বিয়ে করবে, তার আরও সন্তান হবে।

জাতিসংঘ-মিয়ানমার সমঝোতা প্রত্যাখ্যান রোহিঙ্গাদের :প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘ ও মিয়ানমারের এক সমঝোতা চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন রোহিঙ্গারা। তারা দাবি করেছেন, সমঝোতায় রোহিঙ্গাদের বিষয়টিই মাথায় রাখা হয়নি। প্রত্যাবাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে না এই সমঝোতা।

সমঝোতা চুক্তি ফাঁস হওয়ার পর রোহিঙ্গা নেতা ও অধিকারকর্মীরা জানান, শরণার্থীদের মূল বিষয়টিই নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে চুক্তিটি। বাংলাদেশে বাস করা রোহিঙ্গাবিষয়ক অধিকার কর্মী কো কো লিন বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে এই সমঝোতাটি করা। অথচ অদ্ভুত বিষয় হলো- কোনো রোহিঙ্গার সঙ্গেই আলোচনা করা হয়নি। সমঝোতা স্মারকে কোনো নিশ্চয়তা নেই, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেবে- এমন কিছু চায় না রোহিঙ্গারা।