এমপিওর নতুন নীতিমালা নিয়ে আপত্তি কেন সরকারকে বিকল্প প্রস্তাব

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৮      

সাব্বির নেওয়াজ ও কামরান সিদ্দিকী

কুষ্টিয়া সদরের বংশীতলা শহীদ স্মৃতি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্বীকৃতি পায় ২০০৪ সালে। গত ১২ জুন প্রকাশিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ অনুযায়ী, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষক-কর্মচারী লাগবে ১৮ জন। এ প্রতিষ্ঠানে আছে মোট আট জন। স্বীকৃতি পাওয়ার সময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল সাড়ে চারশ', বর্তমানে শিক্ষার্থী আছে ২০০। স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাদ আহমেদের দাবি, বছরের পর বছর বিনা বেতনে পড়াতে গিয়ে এ দশা হয়েছে। নতুন নীতিমালার শর্তে তাদের এমপিও বাতিল হবে। নতুন শর্তে এমপিওভুক্তির যোগ্যতা হারাবেন আরও অনেকেই। তাই এই নীতিমালা মানতে নারাজ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন। এই সংগঠনের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষক-কর্মচারীরা বলছেন, নতুন নীতিমালা অন্যায্য। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওবঞ্চিত করার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তাদের। তাই প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে এমপিওভুক্তি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পরও আন্দোলন থেকে সরছেন না তারা।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অতীতে কেবল 'স্বীকৃতি'র ভিত্তিতে এমপিও দেওয়া হলেও এবার সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এক্ষেত্রে ১ জুলাই থেকে বেতন পাবেন শিক্ষকরা। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, এমপিও নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। নীতিমালার ভিত্তিতে আবেদনের পর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। যে মাসেই ঘোষণা আসুক, এক জুলাই থেকেই তারা বেতন পাবেন।

নীতিমালায় আপত্তি কেন : ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভূষণ রায় সমকালকে বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সময় দুরত্ব, জনসংখ্যা, দলিল, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয় এবং ফলের ভিত্তিতে দেওয়া হয় একাডেমিক স্বীকৃতি। অতীতে স্বীকৃতির ভিত্তিতে এমপিওভুক্তি করা হলেও এবার যে নীতিমালা হয়েছে, তাতে অনেক প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হবে।

আন্দোলনকারীরা বলেন, নতুন শর্ত অনুযায়ী ৭০ ভাগ পাসের কথা বলা হলেও প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন অনেকক্ষেত্রেই কঠিন। এ ছাড়াও এমন কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে- যা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অনেক প্রতিষ্ঠান আগেই পূরণ করেছে। কিন্তু ১৫-২০ বছর বেতন ছাড়া প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে অনেক শর্তই রক্ষা করা যায়নি। এ দায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যাবে না। নতুন নীতিমালায় অনেক সরকারি স্কুল এবং

এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানও উত্তীর্ণ হতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তারা।

বিকল্প প্রস্তাব শিক্ষকদের : নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, 'কোনো প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) স্বীকৃতি ও অধিভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ ঐ প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করবে না। সরকার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করবে।' শিক্ষক নেতারা জানান, আর্থিক সংগতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আপাতত সব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে চলতি অর্থবছরে বেতনের ৫০ শতাংশ এবং পরবর্তী অর্থবছরে বাকি বেতন পরিশোধের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সরকার আর্থিক চাপ মোকাবেলা করতে পারবে বলে মনে করেন আন্দোলনকারী শিক্ষকদের নেতারা।

আবেদনের তারিখ চূড়ান্ত হবে সোমবার : নতুন নীতিমালা প্রকাশের পর ২০ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এ সংক্রান্ত দুটি কমিটি গঠন করেছে। আগামী ১৫ জুলাইয়ের পর এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ ধরে নিয়ে কাজ করছে দুই কমিটি। নতুন নীতিমালার ভিত্তিতে অনলাইন সফটওয়্যার নির্মাণের কাজ চলছে। নবগঠিত দুই কমিটির মধ্যে একটি অনলাইন ব্যবস্থাপনাবিষয়ক। এ কমিটির প্রধান এবং বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) পরিচালক ফসিউল্লাহ্‌ সমকালকে বলেন, সোমবার কমিটির বৈঠকের পর আবেদন গ্রহণের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

দেশের ৫ হাজার ২৪২টি নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। ২০১০ সালের পর থেকে বন্ধ থাকা এমপিওভুক্তি নতুন করে চালুর দাবিতে গত ২৭ দিন ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। ২৫ জুন থেকে পালিত হচ্ছে আমরণ অনশন কর্মসূচি। এতে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী অসুস্থ হয়েছেন বলে দাবি আন্দোলনকারীদের।