আজ আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস আলো ছড়াচ্ছে বহু সমবায়

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৮      

নাহিদ তন্ময়

বাংলাদেশে গড়ে উঠছে অসংখ্য নতুন সমবায় সমিতি। এসব সমিতির বেশিরভাগই ক্ষুদ্র আয়ের জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সুবিধা প্রদান করে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

যেমন আশ্রয়হীন ও ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে ভূমি ও বাসস্থান বরাদ্দ করে, দেশের মূলধারায় সংযুক্ত করার প্রয়াসে গড়ে উঠছে আশ্রয়ণ সমবায় সমিতি। ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে এবং নিরাপদ আবাসন স্থাপনের লক্ষ্যে গড়ে উঠছে গৃহায়ন সমবায় সমিতি। পরিবহন খাতে সংশ্নিষ্ট পরিবহন সমবায় দেশের বেকার সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

সমবায় সমিতিগুলো এখন আর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, যৌতুকবিহীন বিয়ে জনসাধারণকে উৎসাহ প্রদান এবং সামাজিক নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন এসব সমিতির সদস্যরা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় টাঙ্গাইলের দি-বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের কথা। এর সদস্য সংখ্যা দুই হাজার ৯৮৭ জন। সমবায়ের নীতি ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৮ সালে গঠিত এ সমিতির সদস্যরা নিজেদের আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। সমিতির সদস্যদের পরিকল্পিত জীবনযাপন, গণতান্ত্রিকভাবে নেতৃত্ব প্রদান, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় উৎসাহ প্রদান, খাদ্যদ্রব্য ভেজাল বা কেমিক্যাল না মেশানোর জন্য জনসাধারনের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, যৌতুকবিহীন বিয়ে জনসাধারণকে উৎসাহ প্রদান করাসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন এই সমিতির সদস্যরা।

আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস পালন করা হয় প্রতিবছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার। সেই হিসেবে এ বছর আজ শনিবার দিবসটি পালিত হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আজ পালিত হবে দিবসটি। সমবায় অধিদপ্তর দিনের শুরুতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বিকেলে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- 'পণ্য এবং সেবার টেকসই উৎপাদন ও ব্যবহার'।

সমবায়ের নীতি ও আদর্শ মেনে ২০০৭ সালে নিবন্ধন নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় কার্যক্রম শুরু করে দ্বারিয়ারপুর পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি। সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন এবং ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে সদস্যদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করাই সমিতির মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা এক হাজার ৭৮৬ জন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এ সমিতি দুস্থ ও অসহায়দের সহায়তা প্রদান, শীতার্তদের বস্ত্র বিতরণ, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, যৌতুকবিরোধী র‌্যালি, খাদ্যে ভেজাল ও কেমিক্যাল মেশানোর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির মতো

সামাজিক কল্যাণমূলক নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে।

সমবায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী কৌশল। সমবায়ের ভিত্তি হলো পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা, একতা এবং সহযোগিতা।

সমবায় অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সমবায়ের মাধ্যমে দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আট লাখ ২৬ হাজার ৭২৮ জন লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ৫৭ হাজার ১৪৫টি সমবায় সংগঠনের এক কোটি ছয় লাখ ৯০ হাজার ৭২৮ জন সদস্য রয়েছে। বর্তমানে সমবায় সমিতিগুলোর কার্যকরী মূলধন প্রায় ১৪ হাজার ৫৪ কোটি টাকা এবং মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৩২ কোটি টাকা। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সমবায়ীরা নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নানা উন্নয়নমূলক কাজে জড়িয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখছেন।

তবে সমবায়ে জড়িয়ে অনেকেই প্রতারণারও শিকার হচ্ছেন। টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে অনেক সমবায়। সমবায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুল মজিদ বলেছেন, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে দেশে টেকসই সমবায় গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে দক্ষ প্রশাসন, সৎ সমবায়ী নেতৃত্ব, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর সমিতি ব্যবস্থাপনা এবং সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। সমবায়ের নামে কোনো অসাধু ব্যক্তি যাতে কোনো অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

সমবায় সংগঠনের ধারণা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমবায় একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেই বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিকভাবেই সমবায়ের নীতিমালার মধ্যে আছে একতা, সাম্য, সহযোগিতা, সততা, আস্থা ও বিশ্বাস, সেবা এবং গণতন্ত্র।

দিবসটি উপলক্ষে আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর বিজয়নগরে হোটেল '৭১-এর মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ দুগ্ধ ইউনিয়নের (মিল্ক্ক ভিটা) সভাপতি শেখ নাদির হোসেন লিপুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা। এ বছর কেন্দ্রীয়ভাবে আলোচনা সভা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন সমবায় সমিতিকে দিবসটি যথাযোগ্যভাবে পালন করার নির্দেশ দিয়েছে সমবায় অধিদপ্তর।

১৮৪৪ সালে যুক্তরাজ্যে প্রথম সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৬৬ সালে ডেনমার্কে সমবায় আন্দোলন শুরু হয়। এক বছর পর আমেরিকায় কৃষক সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সমবায়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তারপর ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে চীন, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ সব দেশে সমবায় গঠন করা হয়। ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রী সংস্থা। ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জনের সমবায় ঋণদান সমিতি আইন জারির মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে সমবায় আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৪০ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদে পাস করা দি বেঙ্গল কো-অপারেটিভ সোসাইটি অ্যাক্ট দিয়ে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সমবায় পরিচালিত হয়। এরপর ১৯৮৪ সালে সমবায় অধ্যাদেশ, ১৯৮৭ ও ১৯৮৯ সালে প্রণয়ন করা হয় সমবায় নিয়মাবলি। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘ সমবায় দিবসের স্বীকৃতি দেয়।