৫ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি খসড়া প্রস্তাব

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৮      

আবু সালেহ রনি

ফৌজদারি মামলা দায়েরের পর তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আইনে সময় বেঁধে দেওয়া থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। বরং আইনের দুর্বলতার সুযোগে বিচার চলাকালে বিবাদীর সময় নেওয়া ছাড়াও মামলার দীর্ঘসূত্রতায় আইনজীবীদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। তদন্ত ব্যবস্থা, সাক্ষ্য, সমন, পরোয়ানা জারিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতায় এমন অনেক নজিরও আছে, যেখানে যুগ যুগ ধরে মামলা ঝুলে আছে।

এ প্রেক্ষাপটে চার বছর গবেষণার পর ২০১৩ সালে প্রায় ১২০ বছরের পুরনো 'ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮' সংশোধনের একটি খসড়া দাঁড় করেছিল আইন মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত খসড়ায় মামলা নিষ্পত্তিতে সময় বেঁধে দেওয়াসহ কম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলো আপসের মাধ্যমে জরিমানা এবং ক্ষেত্রবিশেষ সাজার বিধান রেখে বিদ্যমান কার্যবিধিতে অন্তর্ভুক্ত ৬২টি অপরাধের বিষয়ে সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ ছাড়া প্রায় ২০টি অপরাধকে প্রস্তাবিত খসড়ায় সংযুক্ত করে মামলা নিষ্পত্তিতে বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি লাঘবের পথও সুগম করা হয়েছিল। তবে কোনো কারণ ছাড়াই গত ৫ বছরেও সেই খসড়া আর আলোর মুখ দেখেনি।

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে ৩৪ লাখ ১৬ হাজার ৯৭১টি মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। এর অধিকাংশই ফৌজদারি মামলা। এই সময়ে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মোট ৪ লাখ ৮৫ হাজার ২৬৬টি মামলার মধ্যে ৩ লাখ ৪ হাজার ৭১৯টিই ফৌজদারি মামলা। অন্যদিকে, নিম্ন আদালতে একই সময়ে বিচারাধীন ২৯ লাখ ৩১ হাজার ৭০৫টির মধ্যে ১৬ লাখ ২৭ হাজার ৬০৫টিই ফৌজদারি মামলা।

মামলাজট নিরসনে ২০১৬ সালে জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলনেও ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের প্রস্তাব করেছিলেন উচ্চ ও অধস্তন আদালতের বিচারকরা। ওই সম্মেলনে এক আলোচনা সভায় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি কাজী রেজাউল হক বলেন, বিদ্যমান মামলাজট নিরসনে এডিআরের বিকল্প নেই। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় যে কোনো স্তরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রাখতে আইনে সংস্কার করা প্রয়োজন। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, সিঙ্গাপুরে এডিআর পদ্ধতি প্রয়োগ করে ৬০ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে তিনিও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় আপসযোগ্য মামলার সংখ্যা বাড়াতে পরামর্শ দেন।

এডিআর (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা) যুক্ত করে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের বিষয়ে ২০১০ ও ২০১১ সালে দুই দফা সুপারিশ করে আইন কমিশন। এরপর মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দীর্ঘ গবেষণা ও আইন-সংশ্নিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে ২০১৩ সালে শতাব্দী প্রাচীন ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ সংশোধনের বিষয়ে একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ওই খসড়াটি বিল আকারে সংসদে উপস্থাপনের পদক্ষেপও গ্রহণ করেন। তবে নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মন্ত্রিসভা রদবদল হলে ওই খসড়াটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, 'একটি খসড়া চূড়ান্ত করেছিলাম। কিন্তু কী কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি, বোধগম্য নয়।'

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন,

এডিআর ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোতে মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টি নতুন নয়। ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের বিষয়ে তার মত হলো- বিচারের দীর্ঘসূত্রতা মামলাজটের অন্যতম কারণ। এতে বিচারপ্রার্থীর অর্থ ও সময় বেশি ব্যয় হয়। ফলে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালতে আসতে ভয় পায় মানুষ। আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থায় দ্রুততার সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব। এ জন্য ছোটখাটো ফৌজদারি অপরাধ (যেগুলো আপসযোগ্য) সেগুলো বিকল্প পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করে পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধি আইন সংশোধন করা প্রয়োজন। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলে জনগণও আদালতমুখী হবে।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান ফৌজদারি কার্যবিধিতে আপস-মীমাংসা করা যাবে- এমন প্রায় ৬২টি অপরাধের উল্লেখ ছিল প্রস্তাবিত ওই সংশোধনীতে। তার সঙ্গে আরও প্রায় ২০টি অপরাধকে প্রস্তাবিত খসড়ায় সংযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অবহেলাজনিত মৃত্যু, আঘাতের কারণে মৃত্যু, মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও চুরি। ব্যাংক জালিয়াতির মতো অপরাধও আপস-মীমাংসার যোগ্য অপরাধ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সংশ্নিষ্টরা খসড়ার বিষয়ে জানান, খসড়ায় গুরুতর কোনো অপরাধকে মীমাংসাযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়নি। গুরুতর অপরাধ যেমন হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি বা চাঁদা আদায়- এগুলো মীমাংসাযোগ্য অপরাধ নয়, তাই এগুলো ওই খসড়ায় রাখা হয়নি। এই আপস-মীমাংসার জন্য প্রতি জেলায় 'মধ্যস্থতাকারী' নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছিল খসড়ায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ফৌজদারি কার্যবিধি যদি সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তাহলে তা করা হবে। তবে এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট বা সংশ্নিষ্ট পক্ষগুলো থেকে প্রস্তাব আসতে হবে।

অবশ্য বিদ্যমান ফৌজদারি কার্যবিধি সঠিকভাবে ব্যবহূত হলে এর সংশোধন প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি সমকালকে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি ব্রিটিশ আমলে প্রণীত হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। বিশ্বের অনেক দেশে এটি এখনও কার্যকর। তিনি আরও বলেন, এর আগে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধন করে ঋণ আদায়ের জন্য এডিআরের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। অবশ্য পরে সেটি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।



সম্পাদনা :রাসেল পারভেজ

শব্দ :৬৬২