শামসুর রাহমানের আত্মপ্রকাশের সময়

শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯      

আবিদ আনোয়ার

শামসুর রাহমানের আত্মপ্রকাশের সময়

শামসুর রাহমান [২৩ অক্টোবর, ১৯২৯ - ১৭ আগস্ট, ২০০৬]

কোনো কবির রচনাকর্মে অগ্রজের প্রভাব আবিস্কারের জন্য বিবেচ্য বিষয় হতে পারে দুটি :একটি তার মানসলোকের গতি-প্রকৃতি, আর অন্যটি তার নির্মাণকলা। একজন কবির মানসলোক নির্মিত হয় তার চৈতন্যে ক্রিয়াশীল চিন্তা-চেতনা থেকে। প্রতিবেশে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহের অভিঘাত ও পঠন-পাঠনের অভিজ্ঞতা- এই দু'য়ে মিলে যে সংবেদনশীলতা তৈরি হয় তাতে অনুঘটকের কাজ করে কবির স্বজ্ঞা ও মেধাশক্তি। ফলে একই প্রতিবেশের বাসিন্দা হলেও সব কবির মানসলোক একরকম হয় না।

কবিদের মানসলোকের এই গঠন-প্রক্রিয়ায় খুব বড়ো রকমের প্রভাব ফেলে অগ্রজের উত্তরাধিকার। প্রায় একই সময়ের বাসিন্দা হয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম দুই ভিন্ন মানসলোকের অধিকারী। প্রবেশলগ্নে জীবনানন্দ দাশ তাঁর মানস-গঠনে, এমনকি সামান্য ব্যতিক্রম বাদে, নির্মাণকলাতেও প্রবলভাবেই প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম দ্বারা। জীবনানন্দের সতীর্থ হয়েও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর প্রবেশলগ্নের মানস-প্রকৃতি গঠনে ও নির্মাণকলায় উত্তাধিকার হিসেবে ব্যবহার করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাকে। তিরিশের অন্য এক প্রধান কবি বুদ্ধদেব বসু তাঁর প্রবেশলগ্নে নির্মাণ করেছিলেন পূর্বোক্ত দু'জন সতীর্থের সংকরায়নে এক তৃতীয় মানস-প্রতিমা। তাঁর কবিতার নির্মাণকলার বিবেচনাতেও এ-কথা সত্য।

সাতচল্লিশোত্তর কাব্যপ্রয়াসে আমাদের এক বিশাল উত্তরাধিকার এই তিন তিরিশি কবির মানসলোক ও তাঁদের নির্মাণকলা। শামসুর রাহমানকে নিয়ে লিখেছেন এমন সবাই এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শামসুর রাহমান তাঁর প্রবেশলগ্নে ছিলেন জীবনানন্দসংলগ্ন। অর্থাৎ তাঁর প্রাথমিক রচনাকর্মে ছিলো জীবনানন্দ দাশের প্রভাব। এ-বিষয়ে একটি উপাত্ত-নির্ভর বিশ্নেষণের উদ্দেশ্যে এ-লেখার আয়োজন।

এর আগে একটি সত্য ও তথ্য জেনে নেওয়া আবশ্যক। কোনো কবির প্রাথমিক রচনাকর্মে অন্যের প্রভাব আবিস্কারের সূচক যদি হয় কেবল তাঁদের মানসলোকের অভিন্নতা, দু'একটি বাক্যবন্ধ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা-প্রতীক নির্মাণে সাদৃশ্য, তাহলে বাংলা সাহিত্যে তো বটেই, কোনো সাহিত্যেই মৌলিক কবিপ্রতিভা তরুণদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয় টিএস এলিয়টের একটি উক্তি :কবিতায় নতুনত্ব একটি জীবিত বস্তুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা ডালপালা বিস্তারের মতো- মূলকে অবলম্বন করেই তার বিস্তৃতি ও বিকাশ। বুদ্ধদেব বসুও বলেছেন :ক্রিশেকে সভয়ে পরিহার করে চলেন ক্ষুদ্র কবিরা। প্রতিভাবানেরা তাকে হাত পেতে নিয়ে

রূপান্তরিত করেন।

দু'জনের উক্তিতেই প্রকাশিত হয়েছে একটি সত্য। আর তা হলো :অগ্রজের উত্তরাধিকার ব্যবহার করেই প্রতিভাবান কবিরা এক অভিন্ন কবিতাবৃক্ষে নতুন ডালপালার বিস্তার ঘটান এবং প্রাক্তনের রূপান্তর ঘটিয়ে নির্মাণ করেন তাঁদের নিজস্ব কাব্যভুবন।

মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে আরো একটি বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কবিতার ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস মূলত নির্মাণকলার ইতিহাস, ধ্বনিপ্রবাহ বা কণ্ঠস্বর নির্মাণে স্বাতন্ত্র্যের ইতিহাস। কবিতার ভেতরমহলে যেসব রূপকল্প পাঠকচৈতন্যে সৌন্দর্যের বিভা জ্বেলে দিয়ে পাঠককে আলোড়িত করে সেগুলো আজও রয়ে গেছে একই রকম। কেবল এসবের প্রয়োগ-কৌশলে এসেছে কিছু ভিন্নতা। রূপকল্পের আন্তরপ্রকৃতি বদলায়নি একটুও।

অতএব কবির মৌলিকত্ব নির্ভর করে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠস্বর নির্মাণ ও রূপকল্প ব্যবহারে ভিন্নতর প্রয়োগ-কৌশল প্রদর্শনের সফলতার ওপর। এ-সত্যের আলোকে শামসুর রাহমানের প্রাথমিক রচনাকর্ম বিশ্নেষণ করলেও দেখা যায় তিনি জীবনানন্দ দ্বারা কিঞ্চিৎ প্রভাবিত হয়েছেন কেবল তাঁর মানসলোক গঠনে, কিন্তু নির্মাণকলায় নয়। শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে'র ছন্দ-প্রকরণ ও স্বরপ্রবাহের বিশ্নেষণ থেকেই এ-সত্য বেরিয়ে আসবে যে, নির্মাণকলায় তিনি বরং অনেকটা ছিলেন বুদ্ধদেব বসু-ঘেঁষা।

যে-জীবনানন্দ আমাদের কাছে নন্দিত, তিনি 'ঝরা পালক'-এর জীবনানন্দ নন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরা পালক'-এ জীবনানন্দ ছিলেন কিছু ব্যতিক্রম বাদে, কাজী নজরুল ইসলামেরই নবতর সংস্করণ। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'ধূসর পা ুলিপি' থেকে শুরু করে সপ্তম কাব্যগ্রন্থ 'বেলা অবেলা কালবেলা'র জীবনানন্দই আমাদের তিরিশোত্তর বাংলা কবিতার নিকট-অগ্রজ। এসব গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলোর অধিকাংশই রচিত হয়েছে ২২, ২৬ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ৩০-মাত্রার অক্ষরবৃত্তীয় দীর্ঘ পঙ্‌ক্তিতে। এসব অক্ষরবৃত্তীয় রচনার কোনো কোনোটিতে ঘটিয়েছেন দীর্ঘ পঙ্‌ক্তির সঙ্গে ছোট পঙ্‌ক্তির সংমিশ্রণ। ১৪-মাত্রার সনাতন অক্ষরবৃত্তে (আদি পয়ারে) জীবনানন্দ দাশ একটি কবিতাও লিখেন নি। ১৮-মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দে জীবনানন্দ দাশ মাত্র দুটি কবিতা লিখেছেন। এ-দুটি কবিতার শিরোনাম 'আমরা' এবং 'আজ'। দুটি কবিতাই তাঁর জীবদ্দশায় ছিলো অগ্রন্থিত। পক্ষান্তরে শামসুর রাহমান তাঁর প্রবেশলগ্নে (এবং পরেও) ১৮-মাত্রার অক্ষরবৃত্ত এবং ১৮ মাত্রা-অভিমুখী মুক্তক অক্ষরবৃত্ত, ১৪-মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ও ১৪-মাত্রা-অভিমুখী মুক্তক অক্ষরবৃত্তে নিবিষ্ট ছিলেন। এ ছাড়াও মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত ছন্দ তাঁর আজীবন সঙ্গী, যেখানে জীবনানন্দ দাশ তাঁর নজরুল-প্রভাবান্বিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরা পালক'-এর পর এ-দুটি ছন্দকে প্রায় বিদায় জানিয়েছিলেন বলা চলে। তাঁর 'ধূসর পা ুলিপি', 'রূপসী বাংলা', 'বনলতা সেন' ও 'সাতটি তারার তিমির' কাব্যগ্রন্থে একটিও মাত্রাবৃত্তীয় রচনা নেই। 'মহাপৃথিবী'র দুটিমাত্র কবিতা 'প্রার্থনা' ও 'সূর্যসাগরতীরে' মাত্রাবৃত্তীয় রচনা। 'বেলা অবেলা কালবেলা'য় সাতটি কবিতা স্বরবৃত্তে রচিত, যার অনেকগুলোতে রয়েছে বিপত্তিকর বা বিতর্কিত পঙ্‌ক্তি-বিন্যাস।

জীবনানন্দ দাশ মূলত দীর্ঘ পঙ্‌ক্তির অক্ষরবৃত্তের কবি। এর আলোকে শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে'র কবিতাগুলোর পঙ্‌ক্তি-বিন্যাস ও ধ্বনিপ্রবাহ বিশ্নেষণ করা যাক :

শামসুর রাহমানের প্রথম গ্রন্থে কবিতার সংখ্যা আটত্রিশ। এর মধ্যে বারোটি নিটোল ১৮-মাত্রার অক্ষরবৃত্তে রচিত (অবশ্য 'খাদ' নামের একটি কবিতার পঞ্চম পঙ্‌ক্তিতে দুই মাত্রা কম আছে), তেরোটি ১৮ মাত্রা-অভিমুখী মুক্তক অক্ষরবৃত্তে, আটটি ৬-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে, একটি সাত-মাত্রার মাত্রাবৃত্তে, একটি ৭/৫ মাত্রার মাত্রাবৃত্তে, একটি স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের মিশেলে, এবং দুটি গদ্যে রচিত।

উপর্যুক্ত পরিসংখ্যান ও বিশ্নেষণ সাক্ষ্য দেয় :শামসুর রাহমান তাঁর প্রবেশলগ্নেও জীবনানন্দীয় নির্মাণকলার আশ্রয় নেন নি। জীবনানন্দীয় দীর্ঘপয়ারের প্রকৌশলকেই কেবল তিনি এড়িয়ে চলেন নি; অক্ষরবৃত্ত ছন্দে শামসুর রাহমানের পর্ববিভক্তিও জীবনানন্দ থেকে ভিন্ন। জীবনানন্দ দাশে পর্ববিভক্তির যতি সুস্পষ্টভাবে শ্রুত হয় এবং কোমল শব্দ ব্যবহারের কারণে পর্বগুলো স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যের চেয়ে প্রলম্বিত মনে হয়। কিন্তু শামসুর রাহমানের অক্ষরবৃত্তীয় পর্ববিভক্তির যতি অনুভবের জন্য পাঠককে অভিনিবেশী হতে হয়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের 'অপাঙ্‌ক্তেয়' শীর্ষক কবিতাটির অংশবিশেষ বিশ্নেষণ করে এ-সত্য প্রমাণ করা যায় :

যেহেতু লৌকিকতার দড়িদড়া ছিঁড়ে বেপরোয়া
উঁচিয়ে মাস্তুল সুন্দরের ভাস্বর সে নীলিমায়
ভ্রমণবিলাসী তাই সম্মিলিত মুখর প্রস্তাবে
দিয়েছো উন্মাদ আখ্যা; উপরন্তু চিরশত্রু ভেবে
আমাকে করেছো বন্দী সন্দেহের অন্ধ ঊর্ণাজালে।
. . . . . . . . .
মিথ্যাকে কখনো ভুলে সুন্দর ফুলের রমণীয়
স্তবকের মত আমি পারিনি সাজাতে বঞ্চনায়

এ-উদ্ৃব্দতির প্রথম পঙ্‌ক্তি থেকে চতুর্থ পঙ্‌ক্তির 'আখ্যা' শব্দটি পর্যন্ত এমনভাবে শব্দ বিন্যস্ত হয়েছে যে, একশ্বাসে পুরো বাক্যটি শেষ না-করে পারা যায় না, অর্থাৎ পর্ববিভাজনের যতিগুলো প্রায় বিলুপ্ত। 'লৌকিকতার' সঙ্গে 'দড়িদড়া', 'দড়িদড়া'র সঙ্গে 'ছিঁড়ে', 'ছিঁড়ে'র সঙ্গে 'বেপরোয়া', 'বেপরোয়া'র সঙ্গে 'উঁচিয়ে মাস্তুল' এবং 'নীলিমায়'-এর সঙ্গে 'ভ্রমণবিলাসী' এমনভাবে গ্রথিত যে, শ্বাস নেবার উপায় নেই। অধিকন্তু লক্ষণীয় যে, শেষ পঙ্‌ক্তির প্রথম শব্দ 'স্তবকের'-এর বিশ্নেষণ হিসেবে ব্যবহূত 'রমণীয়' শব্দটি এর আগের পঙ্‌ক্তির শেষ শব্দ। এরকম শব্দ ও পঙ্‌ক্তিবিন্যাসের ফলে নিটোল অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত হলেও এতে যুক্ত হয়েছে একটি গদ্যময়তার ঢঙ [অনেক পাঠক ও নবীন কবিকর্মী এধরনের আঙ্গিক বুঝতে না-পেরে একে ভুলক্রমে গদ্য কবিতা মনে করেছেন। শামসুর রাহমান-প্রভাবিত নবীন কবিরা অনেকেই ছন্দ শেখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন নি। কারণ তাঁরা ভেবে নিয়েছেন তাদের গুরুজন গদ্যে কবিতা লিখেন, তারা ছন্দে লিখবেন কেন? খুব কমসংখ্যক তরুণ ও নবীন কবি বুঝতে পেরেছেন এসব বৃত্তীয় রচনা কত কঠিন গাণিতিক নিয়মে বাঁধা এবং মাত্রা গুণে-গুণে বিন্যস্ত। বেশ কবিত্বশক্তির অধিকারী হয়েও ষাটোত্তর প্রজন্মের অনেকে ছন্দ বিষয়ে অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে প্রকৃত কবিতাবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন]

তিরিশি আধুনিকতার একটি লক্ষ্য ছিলো রাবীন্দ্রিক লালিত্য থেকে ভাষাকে মুক্তি দেওয়ার কৌশল হিসেবে আটপৌরে শব্দ ব্যবহার করে তাকে যথাসম্ভব মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে আসা। তিরিশি কবিদের মধ্যে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল হয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ, কিন্তু তবুও সুস্পষ্ট পর্ববিভাজনের কারণে তাঁর অক্ষরবৃত্তীয় রচনায়ও একধরনের লালিত্য লেগেই ছিলো :

১.

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
. . . . . . . . .
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য, অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর

কিংবা
২.

হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে

জীবনানন্দ দাশের এরকম অজস্র পঙ্‌ক্তির লালিত্য ও সঙ্গীতময়তা অগ্রজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সতীর্থ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের চেয়ে কম, কিন্তু কোনক্রমেই তাকে মুখের ভাষার কাছাকাছি বলা যাবে না। [বলে নেওয়া ভালো, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষাভঙ্গি বরাবরই ছিলো প্রায়-রাবীন্দ্রিক; পরিণত বয়সে লেখা 'শেফালি অঙ্গুলি তব গণ্ডে মম বিচরে কৌতুকে'র মতো পঙ্‌ক্তি এর সাক্ষী হিসেবে উদ্ৃব্দত করলাম]।

শামসুর রাহমানের শব্দ ও পঙ্‌ক্তি-বিন্যাসে পর্বের যতি অস্পষ্ট বলেই ভাষার প্রবহমানতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে তিরিশি কবিদের ঘোষিত ও আকাঙ্ক্ষিত মুখের ভাষা কবিতার ভাষা হয়ে উঠেছে শামসুর রাহমানের হাতেই সবচেয়ে সফলভাবে। এ-বিষয়ে তাঁর পূর্বসূরিদের মধ্যে একমাত্র আহসান হাবীব-এর নাম স্মরণীয়। আবুল হোসেনও মুখের ভাষায় কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাঁর কবিত্বশক্তি ছিলো আহসান হাবীব-এর তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।

মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ব্যবহারে শামসুর রাহমানের ভাষাভঙ্গি তাঁর প্রবেশলগ্নেই ছিলো জীবনানন্দ দাশের চেয়ে অনেক অগ্রসর। জীবনানন্দ দাশের মাত্রাবৃত্তীয় রচনায় ভাষাভঙ্গি ছিলো নজরুল-প্রভাবান্বিত। দুটি উদাহরণ :

১.

স্বপন সুরার ঘোরে
আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দিওয়ানা করে
জনম ভরিয়া সে কোন হেঁয়ালি হ'ল না আমার সাধা
পায় পায় নাচে জিঞ্জির হায়, পথে পথে ধায় ধাঁধা
(আমি কবি,-সেই কবি, ঝরা পালক)

২.

মহামৈত্রীর বরদ-তীর্থে-পুণ্য ভারতপুরে
পূজার ঘণ্টা মিশেছে হরষে নামাজের সুরে সুরে
আহ্নিক হেথা শুরু হয়ে যায় আজান বেলার মাঝে
মুয়াজ্জেনের উদাস ধ্বনিটি গগনে গগনে বাজে
(হিন্দু-মুসলমান, ঝরা পালক)

জীবনানন্দের পরিণত বয়সে রচিত 'মহাপৃথিবী'র 'প্রার্থনা' ও 'সূর্যসাগরতীরে'শীর্ষক দুটি কবিতার মাত্রাবৃত্তীয় ধ্বনিবিন্যাস এরকম:


আমাদের প্রভু বীক্ষণ দাও, মরি নাকি মোরা মহাপৃথিবীর তরে
পিরামিড যারা গড়েছিলো একদিন, আর যারা ভাঙে গড়ে

২.
সূর্যের আলো মেটায় খোরাক কার
সেই কথা বোঝা ভার।
অনাদি যুগের অ্যামিবার থেকে আজিকে ওদের প্রাণ
গড়িয়া উঠিলো কাফ্রির মত সূর্যসাগরতীরে

বহু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে, তাঁর কাব্যপ্রয়াসের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে রচিত জীবনানন্দ দাশের এসব মাত্রাবৃত্তীয় পঙ্‌ক্তিতেও রবীন্দ্র-নজরুল যুগের লালিত্য ও ভাষার কেতাবি রূপটি সুস্পষ্ট। শামসুর রাহমান তাঁর প্রবেশলগ্নের (প্রথম কাব্যগ্রন্থেই) স্বভাবেই লালিত্যময় মাত্রাবৃত্তীয় রচনাতেও যে-ধ্বনিপ্রবাহ সৃষ্টি করেছেন, তা আধুনিকতর, আটপৌরে ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে, স্বাভাবিক এবং মুখের ভাষার অভিমুখী :

১.

শুধু দু'টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ
অথবা প্রখর ধু ধু পিপাসার আঁজলা-ভরানো পানীয়ের খোঁজ
শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহেপ্তর কাছে এসে রোজ
চাইনি তো আমি

২.

ছায়া-করে-আসা দূরের পথের
সাঁকো পেরোবার ধীর-মুহূর্তে
পাশাপাশি শুধু হেঁটেছি দু'জন
জীবনানন্দ দাশ ও শামসুর রাহমানের স্বরবৃত্তীয় রচনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য আরো বেশি লক্ষণীয়।


বস্তুতপক্ষে কবিতার শারীর-কাঠামোই রূপকল্পের প্রয়োগ-কৌশল এবং ভাষাভঙ্গিও শাসন করে। সে-আলোচনা ভিন্ন পরিসর দাবি করে। এ-বিশ্নেষণের আলোকে অন্তত এটুকু বলা যায় :শামসুর রাহমানের কবিতার আঙ্গিক তাঁর প্রবেশলগ্নেই ছিলো জীবনানন্দ দাশ থেকে ভিন্ন। তাই, কেবলমাত্র মানসলোকের কিছুটা অভিন্নতার কারণে তাঁর প্রবেশলগ্নের রচনাকর্মে জীবনানন্দের প্রভাব আবিস্কার যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ কবিতার নির্মাণকলাই কবির মৌলিকত্বের প্রধান সূচক।