চামড়া দান-সদকার বিকল্প খুঁজুক মাদ্রাসা-এতিমখানা

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২২ আগস্ট ২০১৯

আবু রুফাইদাহ রফিক

বর্তমানে চামড়ার দাম অস্বাভাবিক হারে পড়ে যাওয়ায় দেশের মাদ্রাসা, এতিমখানা তথা যেসব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানুষের দানের ওপর নির্ভর করে চলছে, সেগুলো বিপাকে পড়েছে। এ অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষার্থে আমাদের ভাবতে হবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলো যারা পরিচালনা করছেন তাদের উচিত হবে, মাদ্রাসার আয়ের বিকল্প উপায় খোঁজা। মাদ্রাসা পরিচালনায় কীভাবে দানের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়, এমন কিছু উপায় বের করতে হবে। বিশেষ করে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার আগেই আমাদের দান ব্যতিরেকে অন্য কোনো হালাল পন্থা বা খাত বের করতে হবে, যা থেকে আয় আসবে। যেমন- ছাত্রদের থেকে নির্দিষ্ট হারে বেতন নেওয়া, মাদ্রাসার মালিকানাধীন খালি জায়গায় দোকান করে ভাড়া দেওয়া, মাদ্রাসার পুকুরে মাছচাষ ইত্যাদি খাত সৃষ্টি করা। তাছাড়া দরিদ্র ছাত্রদের দানের জন্য না খাটিয়ে তাদের পরিশ্রমে উদ্বুদ্ধ করা এবং পরিশ্রম করে আয়ের স্থান তৈরি করে দেওয়া। তা হতে পারে টিউশনি কিংবা মসজিদ-মক্তবে চাকরি। তাছাড়া লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে তাদের জন্য ওভারটাইম তৈরি করে মাদ্রাসার আশপাশের বাজারে বা দোকানে কাজের সুযোগ করে দেওয়া। মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে এসব কাজ অনেক বেশি উত্তম। রাসুল (সা.) তো মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে কাঠ বিক্রি করে রোজগার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সব নবী বকরি চরিয়েছেন; দাউদ (আ.) কামারের কাজ করেছেন। সুতরাং গরিব ছাত্রদের ভিক্ষায় না নামিয়ে এসব কাজে লাগানো তাদের মর্যাদা রক্ষায় অধিক সহায়ক।

মাদ্রাসার ছাত্ররা শ্রেষ্ঠ সন্তান, সত্যের পথে আহ্বানকারী। তাই আগে তাদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। তারা যাদের কাছে হাত পাততে বাধ্য, তাদের কীভাবে তারা দ্বীনের দাওয়াত দেবে, তারা তো তাদের করুণার কাছে বন্দি! 'এ কালেকশনে এত এত টাকা আসছে, এটা বাদ দেওয়া যাবে না'- এমন মনোভাব দেখা যাচ্ছে বর্তমানে! দ্বীন প্রচারের স্বার্থে নবী-রাসুল (আ.) কিংবা সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এভাবে মানুষের কাছে হাত পাতেননি, বরং কষ্ট করেছেন। কখনও রাসুল (সা.) যুদ্ধের প্রয়োজনে অথবা গরিব কোনো প্রতিনিধি দলের আগমনে উপস্থিত সাহাবাদের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। ঈদের নামাজের পর তিনি বিশেষ করে নারী সাহাবিদের থেকেও দান উঠাতেন। রাসুলের এই চাওয়াটা ছিল শুধু সাহাবিদের কাছে, অন্যদের কাছে গিয়ে নয়। আমরা যেভাবে দ্বীন প্রচারের নামে মানুষের কাছে হাত পাতি, রাসুল এবং সাহাবারা কখনও সে রকম করেননি।

আমরা দ্বীনের কাজ করতে গিয়ে আলল্গাহর সাহায্য না চেয়ে এবং আলল্গাহর ওপর ভরসা বাদ দিয়ে মানুষের দানদক্ষিণার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এ জন্য আমাদের ভেতরের রুহানিয়্যত শক্তি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়েছে, মাদ্রাসাগুলো দ্বীন শিক্ষার কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও নৈতিকতা-শূন্য হয়ে পড়েছে। আলল্গাহ পবিত্র কোরআনে অনেকবার বলেছেন, মুমিনরা যেন আলল্গাহর ওপরই ভরসা করে (আলে ইমরান ১৬০, নিসা ১২২, মায়েদাহ ১১, তাওবাহ ৫১, ইবরাহিম ১১, মুজাদালাহ ১০, তাগাবুন ১২)। তিনি অন্যত্র বলেন, যে আলল্গাহর ওপর ভরসা রাখবে, আলল্গাহই তার জন্য যথেষ্ট হবে। আলল্গাহ আরও বলেন, যে আলল্গাহকে ভয় করে, আলল্গাহ তার জন্য উপায় বের করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেন যে, সে কল্পনাও করতে পারে না (তালাক ২-৩)। কোরআনের এসব আয়াত আমরা পড়ি ও পড়াই; কিন্তু আমলে নেওয়ার চেষ্টা করি না। মাদ্রাসা টেকানোর নামে আমরা আজকাল ইমান বিক্রি করে দিচ্ছি। যাদের আমরা বাতিল বলে আখ্যায়িত করি, তাদের দানের ওপরই আবার নির্ভর করি! অথচ দ্বীনের কাজে আলল্গাহর ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বড় শক্তি।

আমরা নেতৃত্ব চাই অথচ ভুলে যাই, দান তোলার মাধ্যমে নেতৃত্ব আসে না, দান করার মাধ্যমেই নেতৃত্ব লাভ করা যায়। তাই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাকারীদের বিনীতভাবে বলছি, দান-সদকা কিংবা জাকাত-ফিতরা ও চামড়া কালেকশনের মাধ্যমে মাদ্রাসার উন্নয়ন বা পরিচালনার চিন্তা শুরুতে একেবারেই বাদ দিতে হবে। শুরুতেই যদি দানের চিন্তা মাথায় আনা হয়, তাহলে সবসময় দানের ওপরই নির্ভর করতে হবে। বর্তমানে দেখা যায়, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সময়ই দানের খাত নির্ধারণ করা হয়। অথচ উচিত হচ্ছে, দান ব্যতীত অন্য কোনো খাত নিয়ে চিন্তা করা। রাসুল (সা.) ও তাঁর বংশের লোকদের জন্য জাকাত কিংবা দান গ্রহণ নিষিদ্ধ। আলেমরা নবীর ওয়ারিশ; তাই যথাসম্ভব আলেমদেরও এসব থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো আলেম দরিদ্র ও কর্মক্ষম না হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জাকাত কিংবা চামড়ার অর্থ নিতে পারেন। কিন্তু মাদ্রাসার উন্নয়ন অথবা শিক্ষকদের বেতনের জন্য এসব উৎস থেকে অর্থ গ্রহণ উচিত নয়। অনেকে মনে করেন, জাকাতের আটটি খাতের মধ্যে 'ফি সাবিলিলল্গাহ' বা 'আলল্গাহর পথে ব্যয়' একটি হওয়ার কারণে জাকাতের অর্থ মাদ্রাসার কাজে লাগানো যাবে। অথচ প্রাথমিক যুগের আলেমদের মত হচ্ছে, এখানে 'ফি সাবিলিলল্গাহ' বলতে আলল্গাহর পথে জিহাদ তথা যুদ্ধব্যয়কে বোঝানো হয়েছে।

উলেল্গখ্য, আমাদের দেশের অধিকাংশ মাদ্রাসার সঙ্গে এতিমখানা থাকে এবং মাদ্রাসাগুলোতে গরিব ছাত্ররাই বেশি পড়াশোনা করে, যারা বেতন দিয়ে পড়াশোনা করতে অক্ষম। তাই এদের জন্য 'গোরাবা ফান্ড' বা দরিদ্র তহবিল রেখে সেখান থেকে তাদের জন্য ব্যয় করতে হয় বিধায় এ তহবিলে জাকাতের অর্থ জমা করা হয়। এ ক্ষেত্রে যা করা উচিত তা হচ্ছে, বিত্তশালী মুসলিমদের এ তহবিলের ব্যাপারে অবহিত করা, যেন তারা এতে জাকাতের অর্থ প্রদান করে। কিন্তু এ তহবিলের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়া আলেমদের জন্য শোভনীয় নয়।

পরিশেষে ইমাম ইবনুল জাওজীর (রহ.)  একটি বাণী উদ্ৃব্দত করে শেষ করছি :তিনি বলেন, দ্বীনদার ও আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন একজন আলেমের উচিত মিতব্যয়ী হওয়া, স্বল্প আয় করা ও অল্পে তুষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগামী হওয়া। এতে তার দ্বীন ও সম্মান রক্ষা পাবে এবং নীচু মানুষদের কাছ থেকে দান-খয়রাত গ্রহণ করা থেকে তিনি অমুখাপেক্ষী থাকবেন।

আরবি প্রভাষক, জয়নারায়ণপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, নোয়াখালী