শবেবরাতের গুরুত্ব ও ফজিলত

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০১৯

মুফতী মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল

শাবান মাসের পঞ্চদশ রজনী তথা শবেবরাত মুসলিম উম্মাহর কাছে একটি মহিমান্বিত, তাৎপর্যমণ্ডিত ও ফজিলতপূর্ণ রাত। রাসুল (সা.) এ রাতকে 'লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান' তথা ১৫ শাবানের রাত বলেছেন। এই বিশেষ রাতের ব্যাপারে কোরআনে সরাসরি কোনো উলেল্গখ পাওয়া যায় না। অবশ্য কেউ কেউ সুরা দুখানের ৩নং আয়াতে উলিল্গখিত বরকতময় রাতকে শবেবরাত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অন্যরা বরকতময় রাত দ্বারা শবেকদরকে বোঝানো হয়েছে বলে উলেল্গখ করেন। সিহাহ সিত্তাহ হাদিস গ্রন্থের কোনো কোনো হাদিসে এই রাতের বিশেষত্ব নির্দেশক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য হাদিস গ্রন্থেও এই রাতের বিশেষত্বের উলেল্গখ পাওয়া যায়।

অন্য হাদিসে রাসুলুলল্গাহ (সা.) বলেন, আলল্গাহ মধ্য শাবানের রাতে আত্মপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সবকে ক্ষমা করেন (ইবনু মাজাহ :১৩৯০)। আলল্গাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, 'আমি একে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রজনীতে, আমি তো সতর্ককারী। এ রজনীতে প্রত্যক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়' (সুরা দুখান-৩)। হজরত ইকরামা (রা.) ও একদল আলেমের মতে, এ আয়াতে উলিল্গখিত 'মোবারক রজনী' দ্বারা শবেবরাতকে বোঝানো হয়েছে। যদিও অনেকে একে লাইলাতুল কদর বলে মনে করেন। কিন্তু এতে শবেবরাতের সম্ভাবনা একদম নাকচ হয়ে যায়নি। তাই একদল মোফাসসিরিনের মত অনুযায়ী শবেবরাত 'মোবারক রজনী' হওয়ায় এ রাতটি অন্যান্য রাতের তুলনায় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। হাদিস গ্রন্থগুলোতে শবেবরাতের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কিত অনেক হাদিস এসেছে।

আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে আমি নবীকে (সা.) না পেয়ে তাঁর খোঁজে বের হলাম। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি জান্নাতুল বাকিতে তাঁর মাথা আকাশের দিকে তুলে আছেন। তিনি বলেন, হে আয়েশা, তুমি কি আশঙ্কা করেছ যে, আলল্গাহ ও তাঁর রাসুল তোমার প্রতি অবিচার করবেন? আয়েশা (রা.) বলেন, তা নয় বরং আমি ভাবলাম যে, আপনি হয়তো আপনার কোনো স্ত্রীর কাছে গেছেন। তিনি বলেন, মহান আলল্গাহ মধ্য শাবানের রাতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক লোকের গুনাহ মাফ করেন (ইবনু মাজাহ :১৩৮৯)।

আলল্গাহতায়ালা এ রাতে বান্দাদের এক বৃহৎ দলের গুনাহ মাফ করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন বিধায় এ রাতকে লাইলাতুল বারাআত বা গুনাহ মুক্তির রাত বলা হয়। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) বলেন, ট্যাক্স আদায়কারীরা যেমন জনগণের কাছ থেকে পূর্ণ কর আদায় করে তাদেরকে বারাআত বা দায় মুক্তির সার্টিফিকেট হস্তান্তর করেন, আলল্গাহতায়ালাও এ রাতে মুমিন বান্দাদের ক্ষমা করে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সার্টিফিকেট দেন বলে এ রাতের নামকরণ হয়েছে লাইলাতুল বারাআত (তাফসিরে কাবির)। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসুল (সা.) বলেন, মধ্য শাবানের রাতে আলল্গাহতায়ালা দুনিয়ার আসমানে তাঁর রহমত প্রেরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন (তিরমিজি-৭৩৯)। আলল্গাহতায়ালা এ রাতে কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ দান করেন (বায়হাকিস্ফ)। তখনকার সময় আরব দেশে সর্বাধিক সংখ্যক মেষ ছিল একমাত্র সম্বল। উদ্দেশ্য, ওই রাতে আলল্গাহতায়ালার ব্যাপক ক্ষমার প্রতি উম্মতের দৃষ্টি আকর্ষণ।

শবেবরাতের বিশেষ মাহাত্ম্য হচ্ছে, এ রাতে আলল্গাহতায়ালা বান্দার দোয়া কবুল করেন। আবদুলল্গাহ ইবনে উমার থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, পঁাঁচ রাতের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। রজবের প্রথম রাত, শবেবরাতের রাত, জুমার রাত, ঈদুল ফিতর ও কোরবানির রাত (বায়হাকিস্ফ)। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, অর্ধশাবানের রাত বা শবেবরাতে সূর্যাস্তের পরপরই আলল্গাহতায়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতীর্ণ হয়ে বলতে থাকেন, কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিজিক প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দান করব। কোনো বিপন্ন-বিপদগ্রস্ত আছে কি? আমি তার বিপদ দূর করব। এভাবে আরও ব্যক্তিকে ফজর হওয়া পর্যন্ত ডাকতে থাকেন (ইবনে মাজাহ)।

এমন মহিমাময় গুরুত্বপূর্ণ রাতেও আলল্গাহর অশেষ রহমত ও ক্ষমা থেকে কিছু হতভাগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত হয়। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাসুলুলল্গাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, আলল্গাহতায়ালা শাবান মাসের ১৫ তারিখ তথা শবেবরাতে সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমত দান করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তি ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন (ইবনু হিব্বান : ৫৬৬৫)। হাদিসের বর্ণনায় এ হতভাগ্য ব্যক্তিরা হচ্ছে- ১. মুশরিক; ২. হিংসুক; ৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী; ৪. পিতামাতার অবাধ্য সন্তান; ৫. মদ পানকারী; ৬. টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী; ৭. আত্মহননকারী; ৮. জিনাকারী; ৯. একের দোষ অন্যের কাছে বর্ণনাকারী; ১০. গণক বা গায়েবি সংবাদ বর্ণনাকারী; ১১. হস্তরেখা দেখে ভাগ্য নির্ণয়কারী; ১২. অন্যায়ভাবে ট্যাক্স আদায়কারী; ১৩. জাদুটোনার পেশা গ্রহণকারী; ১৪. বাদ্য-বাজনায় অভ্যস্ত ব্যক্তি।

শবেবরাতে রাত জেগে একনিষ্ঠভাবে নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তসবিহ-তাহলিল, দোয়া-দরুদ ও জিকির-আজকারে নিজেকে মশগুল রাখা। রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি পাঁচটি রাতে জাগ্রত থাকবে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে। রাতগুলো হচ্ছে- জিলহজের অষ্টম ও নবম রাত, ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের রাত, শাবানের পঞ্চদশ রজনী (মুনজিরি, তারগিব ওয়াত তারহিব)। এ রাতে নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হয়ে খাঁটি তওবার মাধ্যমে আলল্গাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভের দোয়া করা সুন্নত। কেননা এ রাতে রাসুল (সা.) কবরস্থানে গিয়েছিলেন এবং মৃত মুসলমানদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেছিলেন। দিনের বেলায় রোজা পালন, পরের দিন অর্থাৎ ১৫ শাবান রোজা রাখা। রাসুল (সা.) বলেন, যখন মধ্য শাবানের রাত (শবেবরাত) আসে, তখন তোমরা রাতে দাঁড়িয়ে নফল নামাজ পড়ো এবং দিনের বেলায় রোজা পালন করো (ইবনে মাজাহ, ১৩৮৮)।

শবেবরাতে আতশবাজি, পটকা ফুটানো, মসজিদ, দোকান ও অফিসে আলোকসজ্জা, কবরস্থানে পুষ্প অর্পণ, নারী-পুরুষের সম্মিলিত জিয়ারত, অযাচিত আনন্দ উলল্গাস, বেহুদা কথাবার্তা, ইবাদত-বন্দেগি বাদ দিয়ে অযথা ঘোরাঘুরি, সেলফি ও হালুয়ারুটি বা খানাপিনার পেছনে বেশি সময় নষ্ট করে ইবাদত থেকে বিরত থাকা অবশ্যই নিন্দনীয়। এগুলো শয়তানি কুমন্ত্রণা বৈ কিছুই নয়। কাজেই এ কাজগুলো থেকে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য। আলল্গাহতায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন।

প্রভাষক (আরবি বিভাগ), চাটখিল কামিল (এমএ) মাদ্রাসা, নোয়াখালী
[email protected]