বরকতময় রজনী যেভাবে কাটাবেন

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০১৯

ড. মো. শাহজাহান কবীর

ইসলামে যে কয়টি ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময় রজনী রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পবিত্র শবেবরাত। রহমত ও মাগফিরাতের জন্য মহান আলল্গাহতায়ালার পক্ষ থেকে শবেবরাত এক বিশেষ অনুগ্রহ। অন্যায়, অনাচার ও পাপ-পঙ্কিলতায় জর্জরিত সম্প্রদায়ের জন্য খাঁটি তওবা করে মহান আলল্গাহর নৈকট্য লাভের অপূর্ব সুযোগ এ মহিমান্বিত রজনী। তাই তো বছর ঘুরে যখন শবেবরাত মুসলমানের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হয়, তখন তারা এর ফজিলত ও বরকত হাসিলের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

আরবি শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাতকে শবেবরাত বলা হয়। শবেবরাত শব্দ দুটি ফারসি। শব অর্থ রাত বা রজনী, বরাত অর্থ ভাগ্য। একসঙ্গে এর অর্থ ভাগ্য-রজনী। মহান আলল্গাহ মানবজাতিকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানবসন্তান পৃথিবীতে যাতে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে, সে জন্য দিয়েছেন অসংখ্য নিয়ামত; সেই সঙ্গে দিয়েছেন হালাল-হারাম মেনে চলার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান। দিবস-রজনীর পরিবর্তন এবং আসমান-জমিন সৃষ্টির মধ্যেও রয়েছে অফুরন্ত নিদর্শন। লায়লাতুল বারাআত বা শবেবরাত আলল্গাহর অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে এক অপূর্ব নিদর্শন।

এই মোবারক রজনী বা লায়লাতুল মোবারাকাকেই লায়লাতুল বারাআত বা শবেবরাত বলে ধারণা করা হয়। লায়লাতুল মোবারাকার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মহান আলল্গাহতায়ালা ইরশাদ করেন : এই রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় আমার আদেশক্রমে (সুরা দুখান :আয়াত ৪-৫)। হাদিস শরিফে মধ্য শাবানের এই রাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ উলিল্গখিত আছে। অত্যধিক গুরুত্ববহ এসব হাদিসের একটি হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুলে কারিম (সা.) একদা রাতে সালাত আদায় করছিলেন। তিনি সিজদায় দীর্ঘ সময় থাকলেন। এতে আমার মনে হলো যে, তাঁর ওফাত হয়ে গেছে। আমি যখন এমনটি দেখলাম, তখন শয়ন থেকে উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। ফলে তিনি নড়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠালেন এবং নামাজ শেষ করলেন তখন বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি মনে করেছিলে যে, নবী (সা.) তোমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন? আমি বললাম, আলল্গাহর শপথ, আমি এমনটি মনে করিনি। বরং আপনার দীর্ঘ সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে যে, আপনার ওফাত হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি জান, এটা কোন রাত? আমি বললাম, আলল্গাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) সম্যক জ্ঞাত। তিনি বললেন, এটি মধ্য শাবানের রাত। আলল্গাহতায়ালা এ রাতে বান্দাদের প্রতি তাঁর রহমত প্রেরণ করেন। যারা ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাদের ক্ষমা করেন; যারা দয়া প্রার্থনা করে, তাদের দয়া করেন এবং যারা বিদ্বেষী তাদের একই অবস্থাতে রেখে দেন (বায়হাকিস্ফ, শোয়াবুল ইমান)।

ইবনে মাজায় বর্ণিত- হজরত আলী (রা.) বলেন, রাসুলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন :'১৪ শাবানের রাতে তোমরা বেশি বেশি করে ইবাদত করো এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো।' এ রাতে আলল্গাহতায়ালা সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন :কে আছ আমার কাছে গুনাহ মাফ চাইতে? আমি তাকে মাফ করতে প্রস্তুত। কে আছ রিজিক চাইতে? আমি তাকে রিজিক দিতে প্রস্তুত। কে আছ বিপদগ্রস্ত, আমি তাকে বিপদমুক্ত করতে প্রস্তুত। এভাবে (বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম নিয়ে) ডাকা হতে থাকে সুবেহ সাদিক পর্যন্ত।

১৪ শাবান সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বরাতের রাত শুরু হয় এবং সূর্য উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ রাতের সৌকর্য-মাধুর্য ও মাহাত্ম্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকে। এই রাতের সূচনাকালে সারারাত জেগে ইবাদত করার উদ্দেশ্যে গোসল করার মধ্যেও অশেষ সওয়াব রয়েছে। এছাড়াও তেলাওয়াতে কোরআন, জিকির আজকার, মুরাকাবা-মুশাহাদা, দোয়া-দরুদ, তাওবা-ইসতিগফার পালনে অশেষ সওয়াব নিহিত রয়েছে। এ রাতে দান-খয়রাত ও অন্ন বিতরণের মধ্যেও অফুরন্ত সওয়াব রয়েছে। মধ্য শাবানের এই রাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা মুনওয়ারার বিখ্যাত কবরস্থান জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে কবর জিয়ারত করতেন। সুতরাং আমাদেরও উচিত কবর জিয়ারত করা। সম্ভব না হলে দূর থেকে মৃত পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীসহ সবার জন্য দোয়া করা। এই দোয়া যারা পৃথিবী ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন, তাদের জন্য অনেক ফায়দা বয়ে আনবে। মহান আলল্গাহতায়ালা আমাদের এ মহান রজনী যথাযথ মযাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে পালনের তৌফিক দান করুন।

সহকারী অধ্যাপক, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা