কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদে প্রস্তাব অনুমোদন

ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড ও এনআরবি গ্লোবাল

বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের চূড়ান্ত লাইসেন্স এবং পিপলস ব্যাংককে এলওআই দেওয়ার সিদ্ধান্ত

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

সমকাল প্রতিবেদক

সুদভিত্তিক ব্যাংকিং পরিহার করে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের অনুমোদন পেল বেসরকারি খাতের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের গতকালের বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক নাম বদলে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈঠকে প্রস্তাবিত বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের চূড়ান্ত লাইসেন্স এবং পিপলস ব্যাংককে আগ্রহপত্র (এলওআই) দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বেসরকারি খাতের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ আর এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতা নিজাম চৌধুরী। ২০১৩ সালে নতুন ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। যার মধ্যে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক অন্যতম।

জানা গেছে, বেশ আগে থেকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের চেষ্টা চালিয়ে আসছে স্ট্যান্ডার্ডসহ পাঁচটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো আইএফআইসি, যমুনা, এনসিসি এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স। সম্প্রতি এ তালিকায় যুক্ত হয় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। এসব ব্যাংক নিজ পরিচালনা পর্ষদে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করলেও আগে সাড়া মেলেনি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভাগীয় পর্যায়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর গতকালের পরিচালনা পর্ষদে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মপ্রাণ। এ কারণে কোনো কোনো প্রচলিত ধারার ব্যাংক ব্যবসায়িক কৌশল বদলাতে চাইছে। আবার প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলো যেখানে ৯০ টাকা দিতে পারে। এ ছাড়া প্রচলিত ধারার ব্যাংকের মতো ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাড়ে ৫ শতাংশ হারে নগদ জমা সংরক্ষণ করতে হয়। অথচ প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ১৩ শতাংশ এসএলআর রাখার বাধ্যবাধ্যকতা থাকলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য তা সাড়ে ৫ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলো যে কোনো সময় আমানতে মুনাফার হার পরিবর্তন করতে পারে। প্রচলিত ধারার ব্যাংক মেয়াদপূর্তির আগে যা পারে না। এসব কারণে প্রচলিত ধারার ব্যাংকের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকে ভালো মুনাফা হয়। ফলে অনেক ব্যাংক হয়তো ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

বর্তমানে দেশে মোট ৫৯টি তফসিল ব্যাংক কার্যক্রমে আছে। এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক রয়েছে আটটি। আর ১৭টি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা বা উইন্ডো রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্‌, শাহ্‌জালাল ইসলামী, এক্সিম, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইসিবি ইসলামিক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে- রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের। তালিকায় আছে বেসরকারি খাতের পূবালী, এবি, দি সিটি, প্রাইম, সাউথইস্ট, ঢাকা, স্ট্যান্ডার্ড, প্রিমিয়ার, ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট ও যমুনা ব্যাংক। আর সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর অনুমতি পেয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি মালিকানার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, আল-ফালাহ ও এইচএসবিসি ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিং রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে সব ব্যাংক মিলে শাখা রয়েছে ১০ হাজার ৪০৬টি। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং শাখা আছে এক হাজার ৩০১টি। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব শাখার মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৬২ হাজার ১১০ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের মোট ১০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকা আমানতের যা ২৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আর ইসলামী ব্যাংকিং শাখার ঋণ রয়েছে দুই লাখ ৫০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের ১০ লাখ ১৭ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা ঋণের যা ২৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। দেশে যে রেমিট্যান্স আসে তার ৩০ শতাংশের বেশি আসে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে। যেখানে কর্মরত জনবল ৩৬ হাজার ৩৩৭ জন।

বেঙ্গল ও পিপলস ব্যাংক :এদিকে প্রস্তাবিত নতুন তিন ব্যাংকের মধ্যে বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে গতকালের পর্ষদ সভায়। ব্যাংকটির ব্যবসায়িক পরিকল্পনাসহ একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন শেষে এ সিদ্ধান্ত দেয় পর্ষদ। এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন। তিনি এফবিসিসিআইর সাবেক সহসভাপতি এবং সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের ভাই। অন্যদিকে ঋণের টাকায় শেয়ার কেনাসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন অনুমোদন আটকে যাওয়া পিপল ইসলামী ব্যাংকের আগ্রহপত্র (এলওআই) দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যাংকটির মূল উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতা এমএ কাশেম।