জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ বাজারের বটতলা এলাকায় মুদি দোকান রয়েছে বিপ্লব সরকারের। আগে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে কোনো পণ্য আনতে দোকান বন্ধ করে রেখে তাকে যেতে হতো। এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দোকানে বসেই বেশিরভাগ পণ্যের অর্ডার করেন। পণ্য চলে আসে দোকানে। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মূল্য পরিশোধও করেন। চিনিকলের পাশেই তার দোকান হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্টশিপ নিয়েছেন তিনি। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মূল্য পান এখানকার আখচাষিরা। শ্রমিকদের মজুরিও দেওয়া হয় মোবাইল অ্যাকাউন্টে।

সব টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে বের না করে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব থেকে কেনাকাটার দাম পরিশোধের পরামর্শও দেন বিপ্লব। উদ্বুদ্ধ করতে কখনও কখনও পাঁচ টাকা ছাড় দেন। ছাড়ের উপায়টা এমন যে, তার দোকান থেকে কেনাকাটা করলে ক্যাশ আউট বাবদ চার্জ কম নেন। এর বাইরে 'টালিখাতা' নামের ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করেন বিপ্লব। যেখানে বাকিসহ সব কেনাকাটার হিসাব লিখে রাখেন।

এই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে ইউনাইটেড নেশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইউএনসিডিএফ) শেপিং ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ট্রান্সফরমেশন বা শিফট কর্মসূচি। মাঠ পর্যায়ে যা বাস্তবায়ন করেছে ডিনেট নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। এ কর্মসূচির আওতায় এসব অঞ্চলের দোকানিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধার্থে বাকি ও কেনাবেচার হিসাব রাখতে 'টালিখাতা' এবং দোকানি ও ডিলারের অনলাইন বেচাকেনার জন্য 'ফিল্ডবাজ' নামের মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে দিয়েছে ইউএনসিডিএফ। পাশাপাশি ইউটিলিটি বিল পরিশোধ এবং যে কোনো ধরনের টিকিট কাটার জন্য 'পে ওয়েল' নামে আলাদা একটি অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে।

দেওয়ানগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকা ভাটিপাড়ায় মুদি দোকান রয়েছে মনোয়ারা বেগমের। গ্রামে ব্যবসায় টিকে থাকতে বাকি দিতে হয়। আগে বেশিরভাগ বাকির হিসাব রাখতেন মুখে-মুখে। এখন ' টালিখাতা' অ্যাপে সব হিসাব লিখে রাখেন। দিন বা মাস শেষে কত বিক্রি হলো, সেখান থেকে কী পরিমাণ আয় এলো- এমন সব তথ্য এখানেই থাকে। ফলে বাকি নিয়ে এখন আর বাড়তি কথা খরচ করতে হয় না। শুধু ডিজিটাল হিসাব রাখছেন তা নয়, দোকান সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখেন। আগে যেনতেনভাবে মালপত্র রাখায় কেউ কিছু কিনতে এলে খুঁজে পেতে অনেক সময় লেগে যেত। থাকার পরও খুঁজে না পাওয়ায় বলে দিতেন, পণ্যটি নেই। এতে করে বিক্রি হতো কম। এখন প্রতিটি পণ্য সাজিয়ে রাখেন। এভাবে একই পুঁজি থেকে বিক্রি ও আয় বাড়িয়েছেন মনোয়ারা।

শুধু এ দু'জন নয়, সামিউল ইসলাম, হোসেন মিয়া, মো. মাসুদসহ জামালপুরের অনেকেই এখন ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন। বাকির হিসাবও লিখে রাখছেন টালিখাতা অ্যাপে। ক্রেতা আকর্ষণে সব পণ্য সাজিয়ে রাখছেন তারা। জামালপুর ছাড়াও শেরপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের মুদি দোকানিদের মধ্যেও এই কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

ইউএনসিডিএফের এ কর্মসূচির আওতায় জামালপুর জেলায় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এমন কয়েকজন দোকানি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে সম্প্রতি দুটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। জামালপুর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত মতবিনিময়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তারা। এ সময় ইউএনসিডিএফের কান্ট্রি প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর আশ্রাফুল আলম, ডিনেটের চিফ প্রোগ্রাম অফিসার মো. ফরহাদ উদ্দিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসায়ীরা ইউএনসিডিএফের এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল লেনদেনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি পুঁজি সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, মুদি দোকানে বিক্রি বাড়লে উৎপাদন বাড়বে। অথচ এ খাত অনেক অবহেলিত। মুদি দোকানিরা ব্যাংক ঋণ পেতে নানা হয়রানিতে পড়েন। এ ছাড়া এ খাতের জন্য কোনো বীমা সুবিধা না থাকায় কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আর উঠে দাঁড়াতে পারেন না। সমস্যার সমাধানে মুদি দোকানিদের জন্য বিনা সুদে বা কম সুদে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়।

মন্তব্য করুন