বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানিতে ভ্যাট ছাড়

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৯      

আবু কাওসার

দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে এমন কেন্দ্র স্থাপন উৎসাহিত করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লায় মূল্য সংযোজন করে (ভ্যাট) ছাড় দেওয়া হয়েছে।

মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমাতে সরকার এ সুবিধা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এ জন্য ভ্যাটে বর্তমানের চেয়ে ছাড় দেওয়া হবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে চলমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানিতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য এ সুবিধা দেওয়া হবে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা আনলে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। বেসরকারি খাতের জন্য এ হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ। এতে কয়লা আমদানিতে সরকারিতে ১০ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি মিলবে। বর্তমানে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য আমদানি করা কয়লায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো শুল্ক্ক বা কর নেই। অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আনতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও আগাম ভ্যাটসহ মোট কর দিতে হয় ২৫ শতাংশ।

সরকার আশা করছে, এ হারে কর ছাড়ের সুবিধা কার্যকর হলে কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ খরচ বর্তমানের চেয়ে অনেকাংশে কমবে এবং সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ পাবেন গ্রাহকরা। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত রোববার ভ্যাট অব্যাহতির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন। এনবিআর সূত্র বলেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন ভ্যাট ছাড়ের এ সুবিধা কার্যকর করতে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। ভেটিং শেষ হলে শিগগির আদেশ জারি করা হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যয়ের ৬৫ শতাংশই যায় কয়লা তথা জ্বালানিতে। তাই কয়লা আমদানিতে ভ্যাট কমানো হলে উৎপাদন খরচ অনেক কমবে। ফলে কম দামে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। তিনি আরও বলেন, কম খরচে শিল্প পণ্য উৎপাদন হলে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হবে। আরও গতিশীল হবে রফতানি খাত।

এনবিআরের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুৎ বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি খাত। ফলে রাজস্ব আহরণে কিছুটা ক্ষতি হলেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ খাতে ভ্যাটে কিছুটা অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য (রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ও পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট) আমদানি করা ফার্নেস অয়েল এবং জ্বালানি খাতে এলএনজির ক্ষেত্রে শুল্ক্ক ও কর রেয়াতি সুবিধা রয়েছে। এর বাইরে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ (ট্যাক্স হলিডে) সুবিধা পাচ্ছে। এসব কর প্রণোদনার উদ্দেশ্য সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং সাশ্রয়ী দামে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলেছে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা উৎপাদন প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। এতে করে সেখানে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা সংকট তৈরি হয়। এ কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে চারটি এবং বেসরকারি খাতে দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে। এসব কেন্দ্রসহ অন্যান্য কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানির প্রয়োজন হবে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, কয়লাভিত্তিক এসব কেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লার ওপর শুল্ক্ক-কর অব্যাহতি না দিলে উৎপাদন ব্যয় বর্তমানের চেয়ে অনেক বাড়বে এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

গত আগস্টের শেষে ভ্যাট ছাড়ে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয় এনবিআরে। এ প্রস্তাবের বিষয়ে এনবিআর ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা সেপ্টেম্বরে যৌথ বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে কর ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এখন ওই সিদ্ধান্ত আদেশ জারি করে কার্যকর করবে এনবিআর।

সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৫৭ লাখ ৫৪ হাজার টন কয়লা আমদানি হয়। এর আগের অর্থবছরে আমদানি হয় প্রায় ৩৪ লাখ টন। এর বিপরীতে দুই অর্থবছরে মোট রাজস্ব

আসে যথাক্রমে এক হাজার ৫১ কোটি ও ৬০০ কোটি টাকা।