ব্যবসায় বাধা দুর্বল ব্যাংক খাত

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

ব্যাংক খাতের সমস্যার ফলে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করেন, উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ম্ফীতির কারণেও ব্যবসার খরচ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং ও সুপারভিশন কার্যক্রমে বিশেষ পরিবর্তন না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে হতাশাও রয়েছে।

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিবেশ নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক জরিপে ব্যবসায়ীদের এমন মতামত উঠে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে করা জরিপের ফলাফল গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে জানায় সিপিডি। রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসা পরিবেশের ওপর জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।

গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা রিপোর্টে তথ্য সরবরাহের প্রয়োজনে 'বাংলাদেশে ব্যবসা পরিবেশ' জরিপ করেছে সিপিডি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের ৭৭ ব্যবসায়ী এতে অংশ নিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে চারজন কৃষি খাতের, ৩২ জন উৎপাদনশীল শিল্প প্রতিষ্ঠানের, ৩৪ জন সেবা খাতের এবং সাতজন অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের। এসব শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীকে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করে সিপিডি।

সিপিডির প্রশ্নের জবাবে জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের ৭৮ ভাগ বলেছেন, ব্যাংক খাতের সমস্যার কারণে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা মারাত্মক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ছে। আর ৮০ শতাংশ ব্যবসায়ী মানি লন্ডারিং বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আর্থিক খাত তার দুর্বল কাঠামোর সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। যেসব ব্যবসায়ীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে তার ৫৫ ভাগ ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, ক্ষুদ্র ও এসএমই খাতের অর্থায়ন সুযোগ কমেছে। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ২১ দশমিক ৪২ শতাংশ ছিল এসএমই খাতের, যা এ বছরের মার্চে এসে ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমেছে। এ ছাড়া সুদের হারও বেড়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল অডিট ও রিপোর্টিং এখন দুর্বল।

জরিপে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মনিটরিং ও সুপারভিশন কার্যক্রমে বিশেষ পরিবর্তন না থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক ব্যবসার ধরন বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিয়ে ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগেও নানা ধরনের বাধা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, অশুল্ক্ক বাধা বেড়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বরং দেশের বাজারে একচেটিয়া ব্যবসার প্রবলতা বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল করতে সরকারকে বেশ কিছু সংস্কার পদক্ষেপ নিতে জরিপে মত দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রাজস্ব নীতি, ব্যাংক খাত, সিভিল সার্ভিস ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সংস্কার উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে গিয়েও ব্যয় বেড়েছে অনেক ব্যবসায়ীর। ব্যবসায়ীরা অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তবে পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল নিয়ে তারা আশাবাদী। ৪৭ ভাগ মনে করেন চলতি বছরে ব্যবসা পরিবেশের উন্নতি হবে। তবে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ইতিবাচক হলেও নতুন ধারার সেবা কবে নাগাদ পাওয়া যাবে তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। একইভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুবিধা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই তাদের কাছে। তবে স্টার্টআপ বিজনেস নিয়ে জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা আশাবাদী।