প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে আর কোনোদিন যাতে হত্যা, ক্যু আর ষড়যন্ত্র না হয়। ঘাতকের বুলেটে আর কোনো শিশুকে যাতে শেখ রাসেলের মতো জীবন দিতে না হয় এবং দেশের অগ্রগতি যাতে থেমে না যায়। এ ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। গতকাল সোমবার বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তার আহ্বান- এই শিশুদের নিরাপত্তা দেওয়া, ভালোবাসা দেওয়া, সুন্দরভাবে গড়ে তোলা, তাদের জীবনকে সার্থক এবং অর্থবহ করার যেন সকলের আদর্শ হয়। বর্তমান সরকার একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশে কোনো অন্যায়-অবিচার থাকবে না। মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে।

শেখ রাসেলের নির্মম হত্যাকাণ্ড স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের আর কোনো শিশুর জীবনে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। একজন শিশুকে হত্যা করা মানেই লাখো কোটি শিশুর জীবনকে শঙ্কায় ফেলে দেওয়া। একটা ফুল পূর্ণাঙ্গভাবে ফোটার আগেই অকালে ঝরে যাবে, তা কারও কাম্য নয়।

তিনি বলেন, আমরা চাই, বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ দেশ হবে। প্রতিটি শিশুর জীবন এই দেশে অর্থবহ এবং সুন্দর হবে। কেউ অকালে ঝরে যাবে না। জাতির পিতা ১৯৭৪ সালেই শিশু নিরাপত্তার জন্য আইন প্রণয়ন করে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ঘাতকের হাতে তারই সন্তানদের মৃত্যুবরণ করতে হয়, হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর থেকে দেশের মানুষকে একটা উন্নত জীবন দেওয়ার সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা প্রদানে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথমবারের মতো পালিত 'শেখ রাসেল দিবস ২০২১'-এর প্রতিপাদ্য 'শেখ রাসেল দীপ্ত জয়োল্লাস, অদম্য আত্মবিশ্বাস' যথার্থ হয়েছে। আমাদের দেশের শিশুরা একটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে আত্মমর্যাদাবোধ নিয়ে গড়ে উঠুক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের শিশুদের ভেতরের যে সুপ্ত প্রতিভা ও জ্ঞান রয়েছে, তা বিকশিত হোক এবং আগামীর বাংলাদেশ যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে গড়ে ওঠে। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশুদের দোয়া ও আশীর্বাদ জানিয়ে তাদের মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করতে বলেন। তিনি বলেন, সম্পদ চুরি হতে পারে বা হারাতে পারে। কিন্তু লেখাপড়া এবং শিক্ষা এটা এমন একটা সম্পদ, যেটা কেউ কারও কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী শিশুদের প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, আমাদের শিশুরা ছোটবেলা থেকে প্রযুক্তি শিক্ষা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে- সেটাই আমার কামনা। ছোট ভাই রাসেলের স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, রাসেল ছোটবেলা থেকে বাচ্চাদের নিয়ে প্যারেড করত। সে বড় ভাই শেখ জামালের মতো সেনা অফিসার হতে চাইত। বেঁচে থাকলে আজকে হয়তো সেনাবাহিনীর বড় অফিসার হতো।

'৭৫-এর হত্যাকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, সেদিন রাসেল মায়ের কাছে যাব বলে কান্না করছিল। তাকেও হত্যা করা হলো। আমার একটাই প্রশ্ন- এ শিশুটির কী অপরাধ ছিল?

শিশু রাসেলের নামকরণের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের পরিবারে পাঠাভ্যাস ছিল। সবাই বই পড়ত, পড়ে শোনাত। তার মা বই কেনার জন্য টাকাও দিতেন। রাসেল কমিক ভালোবাসত। তার জন্য কমিক বই কিনে নিয়ে আসা হতো। আর বাবা বার্ট্রান্ড রাসেলের দর্শন মাকে শোনাতেন। সেগুলো ব্যাখ্যা করতেন। বঙ্গমাতাও সেটা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সে থেকেই তাদের ছোট ছেলের নাম রাসেল রাখা হয়।

এবার শিক্ষা, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিল্পকলা-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু- এ পাঁচ ক্যাটাগরিতে প্রতিটি এক ভরি করে ১০টি 'শেখ রাসেল স্বর্ণপদক', ১০টি ল্যাপটপ ও সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। এ ছাড়া শেখ রাসেল অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের ১০টি ল্যাপটপ এবং লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের (এলইডিপি) আওতায় ৪০ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর মধ্য থেকে সর্বোচ্চ উপার্জনকারীদের মধ্যে চার হাজার ল্যাপটপ প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের অভিনন্দন জানান।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলম এবং শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের মহাসচিব ও শিশু বক্তা আফসার জাফর সৃজিতা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করে।





মন্তব্য করুন