ধর্মকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যারা উগ্রবাদ ও সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে, তারা আদৌ কোনো ধর্মীয় কাজ করছে না। ধার্মিক কোনো হিন্দু কখনোই তার মন্দিরে কোরআন শরিফ নিয়ে যাবেন না। একইভাবে ধর্মভীরু কোনো মুসলমানও এ কাজ করতে পারবেন না। এসব ন্যক্কারজনক কাজ যারা করেছে, তারা কেউই ধার্মিক নয়, সবাই দুর্বৃত্ত। এই দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এই মুহূর্তে খুব জরুরি।

এটা খুব সাধারণ কথা। তবে কেবল কয়েকজনকে শাস্তি দিলেই কাজ হবে না। কেন এই অপ্রত্যাশিত ও অভাবনীয় বিস্ম্ফোরণের ঘটনা ঘটল, তার কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কারণ, এর শিকড় অনেক গভীরে। আমার মতে, মূলত তিনটি কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। প্রথমত. রাজনৈতিক অবস্থা, দ্বিতীয়ত. আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা আর তৃতীয়ত. সাংস্কৃতিক দৈন্য।

প্রথমে আসি রাজনৈতিক অবস্থার ওপরে। মন্দির, বাড়িঘরে হামলার ঘটনা অবশ্যই একটি রাজনৈতিক ঘটনা।

রাষ্ট্রের কর্তব্য ছিল সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বাহিনী রয়েছে। তাদেরও এটা দেখার কথা ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলেছিল, শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাস্তবে ঘটনা ঘটল ভিন্ন। আমি মনে করি, দেশে এখন রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অন্তঃসারশূন্যতা মানুষকে নিরাপত্তাহীন করে তুলছে। এখানে নির্বাচন হয় বটে, তবে তা অর্থবহ নির্বাচন নয়। রাজনীতির নামে ক্ষমতার কাড়াকাড়ি চলে। ধর্মীয় এমন সহিংস ঘটনার পর সরকার বলছে, এ কাজ বিএনপি ও সরকারবিরোধীরা করেছে। সরকারবিরোধীরা বলছে, এ ঘটনায় সরকার জড়িত। একে অপরের দোষ দেওয়ার এই পাল্টাপাল্টিতে আসল দোষী পার পেয়ে যাবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় এখানে সহনশীলতা নেই। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন সবকিছুকে গ্রাস করছে।

আর্থ-সামাজিক অবস্থাও একটা বড় কারণ। যারা উগ্রবাদ ছড়াচ্ছে, সহিংসতার সৃষ্টি করছে, লুটপাট করছে; দেখা গেছে তাদের বড় একটি অংশ বেকার। বয়সে তারা কিশোর ও তরুণ। তাদের কোনো কাজ নেই। হতাশা তাদের গ্রাস করছে। তারা সমাজে ক্ষমতাহীন। সমাজের প্রতি তাদের আক্রোশ। তাই সমবয়সীদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জঙ্গিবাদী এসব ধংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে সে নিজেকে ক্ষমতাবান মনে করছে। তরুণ সমাজের মনে হতাশা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও কর্মহীনতা ভর করেছে। বর্তমান ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার অভাব রয়েছে। নারীকে দুর্বল পেয়ে যেমন এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত ধর্ষণ করে, তেমনি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা-অর্জনায় তারা সহিংসতা ঘটাচ্ছে। কারণ তারাও দুর্বল। দুর্বলের ওপর সবলের এই অত্যাচার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণেই ঘটে।

আমাদের সমাজে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার আজ বড় বেশি অভাব। মানুষ করোনাকালে ঘরের মধ্যে আটকে থাকছে, মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। খেলাধুলা নেই, সিনেমাও দেখছে ঘরে বসে। সামাজিকতার কোনো জায়গা এ ব্যবস্থায় নেই; সামাজিক কোনো অনুশীলনও নেই। আবদ্ধ থাকা মানুষ আক্রোশ অনুভব করে। সমাজের ওপরে তার ক্ষোভ তৈরি হয়।

এখন বলতে চাই, তাহলে আমাদের করণীয় কী? প্রথম কথা হলো, এবারের সহিংসতার ঘটনায় প্রকৃতই জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা। আগের ঘটনাগুলোর কোনো বিচার না হওয়ায় এমন সন্ত্রাস, সহিংসতা বারবার ঘটছে। তাই বিচারের দৃষ্টান্ত রাখা দরকার। এর পরের কথা হলো, রাজনৈতিক অবস্থা বদলাতে হবে। গণতন্ত্রের অনুশীলন ও চর্চা না বাড়ালে সহনশীলতা কমতে থাকবে। দেশে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দরকার। এগুলো অতীব প্রয়োজনীয়।

আমরা দেখছি, দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। তবে সে উন্নয়ন বৈষম্যমূলক। অল্প, সামান্য সংখ্যক মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হচ্ছে। তারা বিপুল টাকা আয় করছে; বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। যে ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে, তাতে কর্মের কোনো সংস্থান হচ্ছে না। বিনিয়োগ হচ্ছে না। বৈষম্যমূলক এ উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে লাগছে না। এতে দেশে এ ধরনের দুগর্তি মাঝেমধ্যেই দেখা দেবে।

আর সংস্কৃতিচর্চা হওয়া দরকার সুস্থ; কোনো উদ্দেশ্যমূলক নয়। পুঁজিবাদী এ সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানার বদলে সম্পদের সমষ্টিগত মালিকানা দরকার। কেন তরুণ-কিশোররা সহিংস হবে? তারাই তো একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছে। সেই তারাই এখন কাজ না পেয়ে বেকার; অলস সময় কাটিয়ে নানা ঘটনার কারণ হচ্ছে। আমি মনে করি, সারাদেশে আমাদের যে পাঠাগারগুলো আছে, সেগুলোকেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে কিশোর-তরুণরা বই পড়বে, লিখবে, খেলবে; কুচকাওয়াজ করবে, ছবি আঁকবে; রাস্তাঘাট-পুল-সাঁকো তৈরিতে শ্রম দেবে; সমাজের বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

এখন কথা হলো, এ কাজটা করবে কারা? যারা মনে করেন, এই অসুস্থ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার; তারা তরুণ-কিশোরদের প্রস্তুত করবেন। দেশে এখন সাংস্কৃতিক জাগরণের একটি বড় আন্দোলন দরকার।



লেখক : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ



মন্তব্য করুন