বাজার নিয়ন্ত্রণে অভিযান জোরদার

সরকার ও চালকল মালিক মুখোমুখি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০

মিরাজ শামস

করোনা দুর্যোগের এ সময়েও চাল কেনাবেচায় অতি মুনাফা করতে মরিয়া চালকল মালিকরা। অন্যদিকে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কঠোর অবস্থানে সরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও মিল মালিকরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। মিল মালিকরা সরকারকে চুক্তিমূল্যে চাল সরবরাহ করতে চাচ্ছেন না। সরকার প্রতি কেজি চালের সংগ্রহমূল্য ৩৬ টাকা ঠিক করে মিলারদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। তারা নানা অজুহাতে কেজিতে তিন থেকে চার টাকা বাড়তি দাম দাবি করছেন। চুক্তি অনুযায়ী মিলগুলো চাল না দিলে শুল্ক্ক কমিয়ে বিদেশ থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা রোধে চালের মিল, আড়ত ও বাজারে অভিযান জোরদার করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থাটি গত মঙ্গলবার দিনাজপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলার চালের মিলে অভিযান পরিচালনা করে দাম তদারকি করে।

সম্প্রতি মিল মালিকরা বাজারে সরবরাহ করা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তারা জানিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাড়তি দামে বাজারে চাল সরবরাহ করছে মিলগুলো। আর বাজারে চালের দাম বৃদ্ধিতে এখন ধানের দামও কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের খুচরা মূল্য ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। এক মাস আগে যা ৩৬ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাজারে বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ থাকায় সরকারকে মিলগুলো চাল দিচ্ছে না। খোলাবাজারে চাল বিক্রি করে বেশি লাভ তুলছে মিলগুলো। গত ৩০ এপ্রিল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়, যার মধ্যে ছয় লাখ টন ধান। এরপর আরও দুই লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত দেয় কমিটি। চলতি বোরো মৌসুমে ২৬ টাকা কেজি দরে আট লাখ টন ধান, ৩৬ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৫ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন আতপ চাল কেনার কথা রয়েছে। ২৬ এপ্রিল থেকে ধান এবং ৭ মে থেকে বোরো চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে; যা আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ৪ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী গত দুই মাসে সারাদেশে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ৭০ হাজার ৬৬১ টন। আর চাল (সিদ্ধ) সংগ্রহ হয়েছে দুই লাখ ৬১ হাজার ৩০২ টন এবং আতপ চাল ৩৩ হাজার ৬৭৪ টন। গুদামে ধান-চাল না আসায় সরকারের বোরো সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে খাদ্যমন্ত্রী আমদানির ঘোষণা দিয়েছেন।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সমকালকে বলেন, বাজার অস্থিতিশীল করা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী চাল আমদানি করা হবে। কৃষকদের স্বার্থ বজায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে ২০১৭ সালের মতো ঢালাওভাবে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে না। এবার মৌসুমে পর্যাপ্ত চাল উৎপাদন হয়েছে। তিনি বলেন, মিলাররা বাড়তি দাম দাবি করলে সরকার তা দেবে না। গত বছর একই দামে তারা ধান ও চাল সরবরাহ করেছে। তখন কৃষক ঠকলেও তারা কেজিতে আট টাকা লাভ করেছে। এবার কম লাভ করে তাদের চাল সরবরাহ করা উচিত। কারণ, কৃষকদের উৎসাহিত করতে ধানের ভালো দাম দিতে চায় সরকার। আবার ভোক্তাদেরও যৌক্তিক দামে চাল কেনার সুযোগ দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশীদ সমকালকে বলেন, সরকার ধানের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে চালের দাম নির্ধারণ করেনি। ধানের দাম ২৬ টাকা হলে চালের দাম ৪০ টাকা হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের চাল আমদানির প্রয়োজন নেই। মোটা ধানের সরবরাহ কম। এর পরেও মিলাররা ৬০ শতাংশ চাল সরবরাহ করলে তা দিয়ে আগামী মৌসুম পর্যন্ত চাহিদা মিটবে। এতে বড় ধরনের সমস্যা হবে না। কারণ, দেশে পর্যাপ্ত ধান রয়েছে।

চালকল মালিকদের এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, তারা যে দামে ধান কিনছেন, তাতে নির্ধারিত দামে সরকারকে চাল দেওয়া সম্ভব নয়। কেজিতে তিন থেকে চার টাকা ঘাটতি রয়েছে। শুরুতে যারা কম দামে ধান কিনেছেন তারা সরকারকে চাল সরবরাহ করেছেন। এখন বেশি দামে কেনা ধান কম দামে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত দামে চাল সংগ্রহের চুক্তি করতে চাননি মিলাররা। তখন কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়েছিলেন, দাম বাড়লে ব্যবস্থা নেবেন।

জানা যায়, এবার বোরোর বাম্পার ফলন বন্যার আগে কৃষকরা ঘরে তুলেছেন। এর ফলে দেশে পর্যাপ্ত ধান ও চাল রয়েছে। তা ছাড়া ওই বছর সরকারি গুদামে মজুদ চাল ছিল আড়াই লাখ টন। এবার তা ব্যতিক্রম। এবার সরকারি গুমামে এখনও ৯ লাখ পাঁচ হাজার টন চাল মজুদ রয়েছে। তা ছাড়া এখন আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম স্বাভাবিক রয়েছে। থাইল্যান্ড, ভারত ও ভিয়েতনামে প্রতি টন চালের মূল্য ৩৭৫ ডলার থেকে ৪৮৫ ডলার আছে। এ হিসাবে প্রতি কেজি চালের মূল্য ৩২ টাকা থেকে ৪১ টাকা।