সিলেট সুনামগঞ্জ ও লালমনিরহাটে আবারও বন্যা

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০

সমকাল ডেস্ক

সিলেট সুনামগঞ্জ ও লালমনিরহাটে আবারও বন্যা

সুরমা নদীর পানি বেড়ে সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার নবীনগর-ধারারগাঁও-হালুয়ারঘাট সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে শহর ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানেও দেখা দিয়েছে ভাঙন। শুক্রবারের ছবি- পঙ্কজ দে

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও উত্তরের জেলা লালমনিরহাটে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার এসব এলাকার নদনদীতে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে নদনদীতে পানি বাড়তে থাকে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে এসব এলাকার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আগামী কয়েকদিনে আরও কয়েকটি জেলা বন্যাকবলিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় বন্যাদুর্গত এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর- সিলেট : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে সিলেটে সবক'টি নদনদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চলে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে; কোথাও কোথাও ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। নগরীর সুরমা নদীর তীরবর্তী বাসাবাড়ি ও নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। নতুন করে জেলায় বন্যা পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের ফসলি জমি আরেক দফা তলিয়ে গেছে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, গতকাল শুক্রবার বিকেল ৩টায় সুরমা নদীর পানি সিলেটে বিপদসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিন সকাল ৯টায় সিলেট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে পানি ৫৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ৪৫ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়।

এদিকে গতকাল বিকেলে কুশিয়ারা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে এই পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া শুরু করে বলে জানায় পাউবো।

গোয়াইনঘাট (সিলেট) : ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের গোয়াইনঘাটে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। পানি বৃদ্ধি পেয়ে মানুষের বসতবাড়িসহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বসতবাড়িতে পানি ওঠায় পানিবন্দি হয়ে অনেকেই তাদের গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে রয়েছেন। বসতবাড়ির পাশাপাশি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কের উপর দিয়ে কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন ফুট উচ্চতায় পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লবিত হয়ে যায়। ফলে সারী-গোয়াইনঘাট ও রাধানগর-গোয়াইনঘাট এবং সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়ক পানিতে তলিয়ে গিয়ে উপজেলা সদরের সঙ্গে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ডাউকি নদীর প্রবল স্রোতে নদীর তীরবর্তী এলাকার কয়েক জায়গায় ভাঙনের খবর পাওয়া গেছে। বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে উপজেলার সারী ও ডাউকি নদীর পানি।

পাহাড়ে বৃষ্টিপাত হলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় মানুষের জানমাল রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্লাবিত এলাকার ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এদিকে, আকস্মিক বন্যায় জাফলং ও বিছনাকান্দি কোয়ারি সংশ্নিষ্ট কয়েক সহস্রাধিক পাথর ও বালু শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব বলেন, ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে গেছে। বন্যায় জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

সুনামগঞ্জ : গত মাসে উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সুরমা নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার ৮৭ ইউনিয়নের ৮৩ ইউনিয়ন এবং ৪ পৌরসভার ৩৬ ওয়ার্ডের ১৮ ওয়ার্ড প্লাবিত হয়। বন্যার সেই ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই আবারও জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। '১০ দিন আগে ঘরেও পানি ওঠছিল, গরু-বাছুর লইয়া পাশের গাঁও মাইজবাড়ির আত্মীয় বাড়িত গিয়া ওঠছিলাম। পানি নামায়, দুই দিন অইছে ঘর পরিস্কার কইরা বাইচ্ছার বাপ আইয়া রাইত থাকঐন। আজকে (শুক্রবার) আরেকবার বারান্দাত (বারান্দায়) আইছে পানি। কিতা করতাম কইনছাইন। একতাতো করোনার লাগি কাম কাজ পাইরা না, অভাবের মাঝে খাইয়া না খাইয়া আছি। এর মাঝে ঘর পরিস্কারঔ করতাম পারছি না, আরবার ডুবি যার। বাঁচতাম কিলা।' সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার নবীনগর উত্তরপাড়ার হতদরিদ্র হুসনা বেগম দুই দফা বন্যায় নিজেদের দুর্ভোগের কথা এভাবেই জানাচ্ছিলেন।

একেবারে পাশেই অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারের নূরে আলম বললেন, 'ধনি-গরিব হকলেই যন্ত্রণাত আছে।' শহরের নবীনগরের হুসনা বেগম কিংবা নূরে আলম কেবল এমন অবস্থায় পড়েননি। জেলার ১১ উপজেলার লাখো পরিবারে এমন দুর্দশা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানান, বন্যাকবলিতদের অনেকে ঘর পরিস্কারও করতে পারেনি। আবার সুরমা নদীর পানি শুক্রবার দুপুর ১২টায় ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজানেও বৃষ্টি অব্যাহত আছে।।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) : ছাতকে গত ২৪ ঘণ্টায় টানা বর্ষণ ও সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আবারও উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। ভারি বর্ষণ ও সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুরমা, চেলা, ইছামতি নদীর পানি উপজেলার সব হাওর ও খালবিলে পানি দ্রুত বৃদ্ধির ফলে এ অঞ্চলে আবারও বড় রকমের বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার, চেলা ও ইছামতির পানি ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

লালমনিরহাট : লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি আবারও বাড়ছে। শুক্রবার সকালে লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ৫ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বেড়ে বিকেল ৩টায় ১৫ সে.মি.-এ দাঁড়িয়েছে। ফলে লালমনিরহাটের আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করছে।