আসছে বাজেট: বিশেষজ্ঞ মত

অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার পদক্ষেপ থাকবে

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০     আপডেট: ০৭ জুন ২০২০

ড. শামসুল আলম

এবারের বাজেট গতানুগতিক হচ্ছে না। কভিড-১৯ এর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কেমন হতে পারে, সেটাই বড় বিবেচনা। এই বিবেচনায় অন্য বছরগুলোর মতো মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিয়ে মাথাব্যথা কম। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি মনে করি, চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হলো, আগামীতে কত ধরা হবে- এসব পরিসংখ্যানের চাইতে মানুষের জীবন রক্ষাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

খাদ্য ও কর্মসংস্থান দিয়ে দরিদ্র মানুষকে কীভাবে একটু ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রধান কাজ হতে হবে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা। এর পাশাপাশি শৃঙ্খলার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে সচল রাখা যায়, সেই চেষ্টাও করতে হবে। এই তিন লক্ষ্য নিয়েই আগামী (২০২০-২১) অর্থবছরের বাজেট বিন্যাস করা হচ্ছে। এ কথা ঠিক, অন্যান্য বারের মতো এবারের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত গণআকাঙ্ক্ষার আলোকেই সাজানো হচ্ছে বাজেট।

বর্তমান সরকারের গত ১১ বছরের মতো গতানুগতিক হচ্ছে না আগামী বাজেট। উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবির ঋণ সহায়তায় স্বাস্থ্য খাতে বড় দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সার্থকভাবে অর্থ ব্যয় করতে পারলে এবং প্রয়োজন মনে করলে আরও প্রকল্প নেওয়া হবে। কৃষি উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থায় জোর দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য পরিবহন খাতকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পদক্ষেপ থাকবে বাজেটে।

সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছি। সে হিসেবে বলতে পারি, কভিডের অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বাজেট হিসেবে আসছে আগামী অর্থবছরের বাজেট। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কভিড-১৯ এর প্রভাব বিভিন্নভাবেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কীভাবে করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায় সে বিবেচনায় স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য দুই মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কাজ। অর্থাৎ পরিস্থিতির আলোকেই সাজানো হচ্ছে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে গত ১০০ বছরে কভিড-১৯ এর মতো এত বড় বিপদ আর আসেনি। এই ভাইরাস সারাবিশ্বেই জীবন-জীবিকা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড- সব এলোমেলো করে দিয়েছে। উন্নত বিশ্ব নিজেদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সে কারণে ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে। করোনায় আমাদেরও জীবনযাত্রা ও উন্নয়নের গতি ব্যাহত হয়েছে। তবে আমার মনে হয়, অন্য সব দেশের মতো আমাদের পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যতটা ব্যাহত হয়েছে, তাতে চলতি অর্থবছরে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি হয়তো হবে না। তবে নেতিবাচক ধারায়ও চলে যাবে না। যে হারেই হোক না কেন; ইতিবাচক ধারায়ই থাকবে। আজকের বাস্তবতায় সারাবিশ্বের কাছে তা একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে।

এখন যা কিছু প্রয়োজন তার উল্লেখযোগ্য হলো- সামাজিক সুরক্ষার নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র শ্রেণিকে সুরক্ষা দেওয়া, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহ চেইনে যাতে কোনো রকম ব্যত্যয় না ঘটে, তার ব্যবস্থা রাখা। এ জন্য পরিবহন ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে দোকানপাট খোলা রাখা; অর্থাৎ মানুষের জীবন-জীবিকা যাতে একেবারে মুখ থুবড়ে না পড়ে সে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী এগুলো আসলেই অপরিহার্য ছিল। তবে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আছে সরকারে। এভাবে মাসের পর মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে দেশে মানবসম্পদের সংকট প্রকট আকার নেবে। অপচয় রোধ করে সরকারের পরিকল্পনার মানসম্পন্ন বাস্তবায়ন ও সরকারের সব বরাদ্দ লক্ষ্যভুক্ত গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছানো গেলে তুলনামূলক ভালো থাকবে আমাদের অর্থনীতি। আমি আশা করি, এ জন্য জনগণ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমও তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করে যাবে।

লেখক :সদস্য (সিনিয়র সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন