'ভালো' চোখেও এখন তারা ঝাপসা দেখেন

চুয়াডাঙ্গায় ভুল চিকিৎসায় দৃষ্টিহারা সেই ২০ জন

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০১৯      

বকুল আহমেদ

চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় একটি করে চোখ হারানো সেই ২০ জন এখন অন্য চোখেও সমস্যায় ভুগছেন। বেশির ভাগই ঝাপসা দেখছেন। কারও চোখে পানি ঝরে, কারও চোখে অসহনীয় যন্ত্রণা। নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখেও যন্ত্রণা করছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ইম্প্যাক্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব রোগীর চোখের চিকিৎসার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। অবহেলার শিকার হয়ে তারা অন্য হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

২০১৮ সালের ৫ মার্চ চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে (ইম্প্যাক্ট হাসপাতাল) চক্ষুশিবিরে ২৪ নারী-পুরুষের চোখের ছানি অপারেশন করা হয়। হাসপাতালের ছাড়পত্র নিয়ে পরদিন বাসায় ফিরে ২০ রোগীর চোখে সংক্রমণ দেখা দেয়। একপর্যায়ে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য আসতে হয় ঢাকায়। অপারেশন করা চোখে 'ইনডোপথালমাইটিস' জীবাণু ছড়িয়ে পড়ায় মার্চেই ১৯ জনের একটি করে চোখ তুলে ফেলতে হয়। তবে হায়াতুন নামে এক নারী চোখ তুলে ফেলতে রাজি না হলেও কিছুদিন পরই সেই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন তিনি।

কয়েকদিন আগে হায়াতুনের নষ্ট চোখ সম্পর্কে তার মেয়ে ফরিদা খাতুন জানান, মায়ের বাম চোখ ভেতরের দিকে দেবে গেছে। দেখতে পান না ওই চোখে। 'ভালো থাকা' ডান চোখের অবস্থাও ভালো নয়। ঝাপসা দেখছেন। যন্ত্রণায় কান্নাকাটি করেন প্রায় সময়।

ইম্প্যাক্ট হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর চোখ হারানোর মতো ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ প্রতিবেদন প্রকাশ হয় সমকাল পত্রিকায়। 'চক্ষুশিবিরে গিয়ে চোখ হারালেন ২০ জন!' শিরোনামের প্রতিবেদনটি আলোচিত হয় দেশজুড়ে। সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত হাইকোর্টে রিট করেন। জনস্বার্থে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট গত বছর ২১ অক্টোবর চোখ হারানো প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। ইম্প্যাক্ট হাসপাতালকে পাঁচ লাখ এবং অস্ত্রোপচারের সময় ব্যবহূত ওষুধ আমদানি ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান আইরিশ কোম্পানিকে পাঁচ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি চোখ হারানো ব্যক্তিরা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন তাদের চোখের চিকিৎসার দায়-দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় ইম্প্যাক্ট কর্তৃপক্ষকে। নির্দেশনার পর নগদ ১০ লাখ টাকা করে হাতে পান ভুক্তভোগীরা।

রিটকারী আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ভুক্তভোগী ২০ জনের চোখের চিকিৎসার দায়ভার বহন করবে ইম্প্যাক্ট কর্তৃপক্ষ। যদি সেই দায়িত্ব পালন না করে সেটা দুর্ভাগ্যজনক।

সেই ২০ জন এখন কেমন আছেন, জানতে গত মঙ্গল ও বুধবার খোঁজখবর নেয় সমকাল। কথা হয় ভুক্তভোগী ও স্বজনদের সঙ্গে। তারা জানান, একটি করে চোখ হারালেও অপর চোখ ভালো ছিল। কিন্তু সেই চোখেও এখন ঝাপসা দেখছেন। কেউ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। কারও চোখে পানি ঝরছে।

ইম্প্যাক্ট হাসপাতালে ভুল অপারেশনে বাম চোখ হারানো একজন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার বারাদি এনায়েতপুরের কৃষক খন্দকার ইয়াকুব আলী। তার ছেলে মো. সুজন জানান, তার বাবার বাম চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তিও কমে আসে। সবকিছুই ঝাপসা দেখছিলেন। এর পর খুলনার একটি হাসপাতালে নিয়ে ডান চোখ অপারেশন করা হয়। সেখানে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ইম্প্যাক্ট মাত্র সাত হাজার টাকা দিয়েছে। আর কোনো চিকিৎসা ইম্প্যাক্ট করাতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

আলমডাঙ্গার মোড়ভাঙ্গা গ্রামের আহাম্মদ আলী হারিয়েছেন বাম চোখ। তিনি জানান, বাম চোখ তো গেছেই চিরদিনের জন্য; এখন ডান চোখের অবস্থাও ভালো নয়। এতটাই ঝাপসা দেখেন, ১০/১২ হাত দূরের মানুষকে চিনতে পারেন না। মাঝেমধ্যে যন্ত্রণা করে। একসময়ের ভূমিহীন আহাম্মদ আলী জানান, হাইকোর্টের নির্দেশে পাওয়া ১০ লাখ টাকার মধ্যে তিনি পাঁচ লাখ টাকায় ভিটে জমি কিনে ঘর তুলেছেন। বাকি টাকা দিয়ে দুই বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে চাষাবাদ করছেন এবং ঋণ পরিশোধ করেছেন এক লাখ টাকা। তিনি বলেন, 'চোখ তো একটা হারিয়েছিই; টাকা পেয়ে উপকার হয়েছে- জমি কিনে বাড়ি করতে পেরেছি।'

আইলহাস পৌলবাগুন্দা গ্রামের খবিরন নেছা হারিয়েছেন ডান চোখ। তার ছেলে বোরহান জানান, ভুল অপারেশনে তার মায়ের ডান চোখ নষ্ট হওয়ার ৩-৪ মাস পর বাম চোখেও সমস্যা দেখা দেয়। গত মার্চে খুলনার একটি হাসপাতালে ওই চোখটি অপারেশন করা হয়েছে। অপারেশনে ৩১ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে ইম্প্যাক্ট দিয়েছে মাত্র সাত হাজার টাকা।

দামুড়হুদার সদাবরি গ্রামের হানিফা বেগমের ছেলে আবু সাইদ বলেন, ইম্প্যাক্টের ভুল অপারেশনে তার মায়ের বাম চোখ তো গেছেই; এখন ডান চোখেও ঠিকমতো দেখতে পারছেন না। চিকিৎসার জন্য ইম্প্যাক্টে গিয়েছিলেন; কিন্তু তারা গুরুত্ব দেয়নি।

একইভাবে ডান চোখ হারানো আলমডাঙ্গার স্বর্ণপট্টির অবনী দত্ত, নতিডাঙ্গার বাম চোখ হারানো ফাতেমা খাতুন, ডান চোখ হারানো কয়রাডাঙ্গার নবীছদ্দিন, ঘোলদাড়ি বাজার এলাকার ঊষা রানী, নাইন্দি হাউলির কুটিলা, দামুড়হুদার তায়েব আলী, জীবননগরের শিংনগরের আজিজুল হক, চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরের গাইদঘাটের বৃদ্ধ গোলজার হোসেন, খাসকওরা গ্রামের লাল মোহাম্মদ, বড়বলদিয়া গ্রামের আয়েশা খাতুন, পারকেষ্টপুরের মধু হালদার, মজলিশপুরের শফিকুল, রংপুর গ্রামের ইখলাস আলী, কোমরপুরের গোলজান ও আলোকদিয়ার ওলি মোহাম্মদ- সবার অভিযোগ, তারা ভুল চিকিৎসায় এক চোখ হারিয়েছেন, এখন অন্য চোখেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে তারা স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছেন না। চিকিৎসার জন্য ইম্প্যাক্ট হাসপাতালে গেলেও তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না।

জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. শাফিউল কবীর বলেন, রোগীদের অভিযোগ সঠিক নয়। যেসব রোগী অন্য চোখের অপারেশন করেছে, ওই অপারেশন ঢাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে করলে খরচ হয় সাত হাজার টাকা। ইম্প্যাক্ট থেকে সাত হাজার টাকা রোগীকে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চোখের সমস্যা নিয়ে রোগী হাসপাতালে এলে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হয়। চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধ দেন, তার পুরোটাই ইম্প্যাক্ট কিনে দেয়।