গণপূর্তে দুর্নীতির ১০ ক্ষেত্র

মন্ত্রীর কাছে দুদকের প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকল্পগুলোর দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রাক্কলন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। এর সঙ্গে ঠিকাদার আর কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনে গণপূর্তে দুর্নীতির ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২০ দফা সুপারিশও তুলে ধরা হয়।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের হাতে প্রতিবেদনটি তুলে দেন দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান। এ সময় দুদক কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, দুদক ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে টিম গঠন করেছে। এর আগে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিমান, রাজউক, ওয়াসা, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ ১৪টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গণপূর্ত নিয়ে এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলো। এই প্রতিবেদনের মূল বিষয় হচ্ছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি তৈরিতে এই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্টেকহোল্ডার, ঠিকাদার ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, এই মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে।

মন্ত্রী রেজাউল করিম জানান, প্রতিবেদনটি তারা গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন। এটা তাদের কাজের গতি বাড়াতে, স্বচ্ছতা আনতে এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রয়োজনে এর ভিত্তিতে তদন্ত করা হবে।

দুদক বলছে, দরপত্র প্রক্রিয়াতেই দুর্নীতি বেশি হয়।

দুর্নীতির দশ ক্ষেত্র :দরপত্র প্রক্রিয়ার দুর্নীতির মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, দরপত্রের তথ্য ফাঁস, সমঝোতার নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এজেন্ট ঠিকাদার নিয়োগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেরামত বা সংস্কার কাজের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা/প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বেনামে বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট প্রকৌশলীর অনৈতিক সুবিধালাভ।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের বড় পরিসরের কাজ ছাড়াও মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। এ বরাদ্দের বিপরীতে কাজগুলো ছোট ছোট লটে ভাগ করা হয়। এসব কাজ তাদের পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়ার জন্য ই-জিপিতে না গিয়ে গোপন দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হলেও আগেই গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে রেট জানিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া পছন্দের ঠিকাদারের যেসব অভিজ্ঞতা রয়েছে সেসব অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে অন্য কোনো ঠিকাদার ওই দরপত্রে অংশ নিতে না পারেন।

অস্বাভাবিক মূল্যে প্রাক্কলন তৈরি :সরকারি বাজেটের একটি অংশ ঠিকাদারের যোগসাজশে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে সিডিউল রেটের বাইরে গিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়।

ছোট প্যাকেজে প্রকল্প প্রণয়ন :বড় বড় প্রকল্প বিশেষ করে ৩০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় অসৎ উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের দায় এড়ানোর জন্য ছোট ছোট প্যাকেজ করে প্রাক্কলন প্রণয়ন, অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ডেলিগেটেড ওয়ার্ক হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্মাণাধীন ছয়টি ভবনে আসবাবপত্রসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের জন্য দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রণয়ন করে ছয়টি প্যাকেজে ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী :গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে অনেক ক্ষেত্রে যে পরিমাণ সিমেন্ট-বালু মেশানোর কথা, তা না করে বালুর পরিমাণ বেশি মেশানো হয়। এ ছাড়া যে ধরনের রড নেওয়ার কথা, তা না করে কম মেজারের রড এবং রডের ঘনত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়।

শর্তানুসারে বাস্তবায়ন না করা :বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধিকাংশ ক্ষেত্রে ই-জিপি টেন্ডারিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেও তার শর্তানুসারে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন না করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঠিকাদারের চাপে বা একশ্রেণির প্রকৌশলী/কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে। ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। কাজ পাওয়ার জন্য অনেক সময় বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরামর্শক সংস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উৎকোচ প্রদান করতে হয়।

প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ :ভবনের মেরামত, সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন, এর এক-তৃতীয়াংশ পাওয়া যায় না। যথাসময়ে বরাদ্দ ছাড়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বিঘ্নিত হয়। এতে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চাহিদা মাফিক করা সম্ভব হয় না।

অনাবশ্যক ব্যয় :প্রকল্প ছক সংশোধন করে অনাবশ্যক প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়। মূলত আর্থিক মুনাফার প্রত্যাশায় প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্প তদারকিতে ধীরগতি :প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রয়োজনের তুলনায় জনবল আনুপাতিক হারে কম থাকায় প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়ন এ পরিবীক্ষণ কাজে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে।

নকশা চূড়ান্তে দেরি :পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে স্থাপত্য অধিদপ্তর প্রায়ই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নকশা সরবরাহ করতে সক্ষম হয় না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটে।

জরুরি ভিত্তিতে কাজ না করা :কর্মকর্তাদের অবহেলা, সদিচ্ছা ও তদারকির অভাবে প্রাক্কলন তৈরি থেকে শুরু করে দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ প্রদান এবং কাজ শেষ করা সংশ্নিষ্ট সংস্থার চাহিদা মতো জরুরি ভিত্তিতে হয় না বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

অসহযোগিতা :পূর্ত অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তর বা সরকারি কোয়ার্টারের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণসহ সেবা দিতে বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগিতার অভিযোগ বাড়ছে।

বিল পরিশোধে বিলম্ব :অনেক সময় প্রকল্পের কাজ শেষে ঠিকাদার বিল দাখিল করলেও প্রকল্প সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা বা নির্বাহী প্রকৌশলী নানা অজুহাত দেখিয়ে বিল আটকে রাখেন। এ ক্ষেত্রে যেসব ঠিকাদারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয়, তাদের বিল আগে পরিশোধ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করা হয়।

বিশ দফা সুপারিশ :এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশ দফা সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। দুদক বলেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়া সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো দুর্নীতি বা জালিয়াতি না হয়, সে জন্য ক্রয়কারী কার্যালয়ের প্রধানের দপ্তরে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠনের কথা বলেছে দুদক।

তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে অহেতুক অযৌক্তিক সময় বাড়ানোর বিষয়টি নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। চুক্তি সইয়ের পর দরপত্র মূল্য মেয়াদকাল ও চুক্তির অন্যান্য শর্ত সুনির্দিষ্ট বিধান ছাড়া পরিবর্তন করা উচিত নয়। কোনো ঠিকাদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ করতে না পারলে তাকে জরিমানার সুপারিশও করা হয়েছে। কাজের গুণগতমান নিবিড় তদারকির জন্য দুই স্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা নামে-বেনামে ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব দূর করার জন্য এবং জাতীয় শুদ্ধাচারের কৌশল হিসেবে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িত আছেন কি-না, তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকারনামা নেওয়ার কথাও বলেছে দুদক।

প্রকল্পের কেনাকাটা, নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য গণশুনানি ও সামাজিক নিরীক্ষা আয়োজনের কথা বলেছে দুদক।

সরকারের বড় নির্মাণ প্রকল্পের কাজে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রাক্কলন তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাস্তবায়ন কাজে জড়িত না করার কথা বলেছে দুদক। নির্মাণ কাজে গাফিলতি কিংবা এজেন্ট বা ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা না মানলে সংশ্নিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।