ডিক্যাব টকে মিয়া সেপ্পো

আবরার হত্যা ভীতিকর ঘটনা

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৯      

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

আবরার হত্যা ভীতিকর ঘটনা

ডিক্যাব টকে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো - সমকাল

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনাকে 'ভীতিকর' উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো। তিনি বলেন, মুক্তভাবে মত প্রকাশ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে হত্যা করার তীব্র নিন্দা জানায় জাতিসংঘ। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে বহু বছরের চলমান সহিংসতায় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনায় দৃশ্যত দায়ীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এর স্বচ্ছ তদন্ত ও যথাযথ বিচার নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

গতকাল বুধবার ঢাকায় কর্মরত কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিক্যাব আয়োজিত 'ডিক্যাব টক' অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বর্তমান কাঠামোর আওতায় অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন মতপ্রকাশ দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ আইন পুনর্বিবেচনায় সরকারের প্রতিশ্রুতির কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ব্যর্থতার দায় সবার। মিয়ানমার এ সংকট তৈরি করেছে; মিয়ানমারকেই এ সংকটের সমাধান করতে হবে।

রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-বিস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ডিক্যাব টকে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন ডিক্যাব সভাপতি রাহীদ এজাজ। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম হাসিব।

বাংলাদেশ ও জাতিসংঘ :অনুষ্ঠানে বক্তব্যে মিয়া সেপ্পো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের যৌথ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিসরে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা ও উন্নয়নে তার প্রতিশ্রুত ভূমিকা পালনের প্রমাণ দিয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নে যথাযথ ভূমিকা নিশ্চিত করে বিশ্বশান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা উজ্জ্বল। একই সঙ্গে শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিরও বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। এখন সময় মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে আরও অগ্রগতি সাধন। এটি জাতিসংঘের স্থিতিশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন :মিয়া সেপ্পো বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী ভূমিকায় নেওয়ার পক্ষে জাতিসংঘ। এ জন্য আইনগত পরিবর্তন প্রয়োজন হলে সেটাও করা দরকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ আইনের বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং গণমাধ্যমের যথাযথ ভূমিকা পালন দুরূহ হয়ে পড়ছে, এমনটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ আইনের কয়েকটি ধারা পুনর্বিবেচনার জন্য কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং অবশ্যই তাদের এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত, যার মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্ব পালনে যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত হয়। এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, সিভিল সোসাইটির ভূমিকা, গণমাধ্যমের ভূমিকা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অবস্থান তুলে জাতিসংঘ প্রতি বছর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে একটি দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের বিষয়টিও প্রতিফলিত হয়।

ফাহাদ হত্যা প্রসঙ্গ :সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার নিজের দুই সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে এত নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটতে পারে, সেটা তার কল্পনারও বাইরে। এ ঘটনা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রিয় সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে ক্যাম্পাসে নিরাপদ আছে- এ নিশ্চয়তা অবশ্যই পিতা-মাতাকে দিতে হবে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, এক বিবৃতিতে মুক্তভাবে মতপ্রকাশ করায় বুয়েটের তরুণ শিক্ষার্থীকে খুনের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ এ ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বহু বছর ধরে যেভাবে সহিসংতা চলমান, তা বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের বিবৃতির উদ্ৃব্দতি দিয়ে তিনি আরও বলেন, সহিংসতার কারণে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। দৃশ্যত এসব হত্যার জন্য দায়ীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে, সমাজে সহিংসতা যেন বন্ধ হয়; সবাই যেন নিরাপদে থাকতে পারে, সে জন্য দায়ীদের শাস্তি না হওয়ার বহু বছর ধরে যে প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন বন্ধ হয়।

রোহিঙ্গা সংকট :চলমান রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে একাধিক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ সংকট মোকাবেলায় জাতিসংঘ শুরু থেকেই বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখছে। রোহিঙ্গাদের মানবিক চাহিদা পূরণ, রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত ও বিচার এবং প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ তার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্যই এ সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাংলাদেশের পাশে সক্রিয়ভাবে থাকা দরকার।

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ চায় রোহিঙ্গাদের নিজের দেশ মিয়ানমারে সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন। তবে গত দুই বছরে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ব্যর্থতার দায় একার জাতিসংঘের নয়; সংশ্নিষ্ট সবার। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এ বিষয়ে তিনি সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন।