১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আলী সেকান্দার, চট্টগ্রাম থেকে

চট্টগ্রামের উপকূলে চলছে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত। সেই উপকূলের কাছেই সাগরিকার জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, যেখানে এখন চলছে ১০ নম্বর সতর্ক সংকেত। মহাবিপদ সংকেত যাকে বলে। এই বিপদ সংকেত দেওয়ার কারণও আছে। সাগরিকার স্টেডিয়ামটিতে গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে আফগান ক্রিকেটাররা ব্যাটে-বলে ঝড় বইয়ে দিচ্ছেন। যে ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। আত্মরক্ষার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। ঝড়টা তুলেছেন মূলত আফগান স্পিনাররা। তাদের ঘূর্ণিপাক থেকে কোনোভাবেই নিজেদের বাঁচাতে পারছেন না স্বাগতিক ব্যাটসম্যানরা। অনিবার্য ধ্বংস দেখেই কি-না গত দুই দিন প্রকৃতির পানে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সেখানেও খুব একটা সাড়া মিলছে না। বৃষ্টির কারণে গতকাল সকালের সেশনের অনেকটা  সময় ভেস্তে গেলেও পরে খেলা হয়েছে। শেষ বিকেলে আবারও এসেছিল বৃষ্টি। তাতে আধঘণ্টা আগে খেলা বন্ধ হয়। তবে এ সময়ের মধ্যেই ১৩৬ রান তুলতে ৬ উইকেট হারিয়ে বসেছে বাংলাদেশ। ৩৯৮ রানের বিশাল টার্গেট থেকে এখনও ২৬২ রানে পিছিয়ে তারা। এই রানকে একপ্রকার অসম্ভব এক টার্গেটই বলা যেতে পারে। সাকিব আল হাসান তা মেনেও নিলেন। তবে হারার আগে অসহায় আত্মসমর্পণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি সতীর্থদের কাছে।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে চলমান একমাত্র এই টেস্টের গতিপথ ম্যাচের তৃতীয় দিনেই বোঝা গেছে। চতুর্থ দিন সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের জয়টা এখন অনেকটা সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পরও মাঠের লড়াইয়ে হাল ছাড়া যায় না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অধিনায়ককে বলতে হয়, চেষ্টা করছি, চেষ্টা করব। সংবাদ সম্মেলনে সাকিবও তাই বলে গেলেন গতকাল। চরম সত্য উপলব্ধি করে বাস্তবিক ফল মেনে নেওয়ার একটা প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছেন তিনি।

বৃষ্টিই কেবল এই টেস্টে পরাজয় থেকে বাঁচাতে পারে বাংলাদেশকে। সাকিবের মতো ক্রিকেটারও এখন বৃষ্টির আশীর্বাদ কামনা করেন। দু'দিন ধরেই টুকটাক বৃষ্টির সহায়তা পেয়েছেন তারা। শনিবার শেষ বিকেলে ২০ মিনিট কম খেলতে হয় বৃষ্টির কারণে। একই কারণে গতকাল খেলা হতে পারেনি ৯০ মিনিট। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হওয়ায় সকালে নির্ধারিত সময়ে পিচ কাভার সরানো যায়নি। এরপর মাঝে একবার এবং শেষে বৃষ্টি হানা দেয় চতুর্থ দিনের খেলায়। এদিন প্রথম সেশন শুরু হয় সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে। এই সেশনের প্রথম ২৩ মিনিটে ২৩ রানে আফগানিস্তানের শেষ দুই উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৬০ রানে অলআউট হয় সফরকারীরা। স্বাগতিকদের টার্গেট দেয় ৩৯৮ রান।

এই বিশাল টার্গেট মাথায় নিয়ে খেলতে নেমেও শুরুটা ভালোই করে বাংলাদেশ। সাদমান ইসলাম ও লিটন কুমার দাস ৯ ওভারে বিনা উইকেটে ৩০ রান নিয়ে চা বিরতিতে যান। কিন্তু দ্বিতীয় সেশনে এসে আর প্রতিরোধের দেয়াল ধরে রাখতে পারেনি ওপেনিং জুটি। একের পর এক উইকেট হারালে ব্যাটিং বিপর্যয় দেখা দেয়। ১২৫ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চতুর্থ দিনই পরাজয়ের শঙ্কায় পড়ে। এ সময় টাইগারদের জন্য আশীর্বাদ নিয়ে আসে বৃষ্টি।

এই টেস্টের শুরু থেকেই ব্যাটিং অর্ডার ওলটপালট করে টিম ম্যানেজমেন্ট। প্রথম ইনিংসে লিটন কুমার দাসকে ব্যাটিংয়ের তিন নম্বর জায়গা ছেড়ে দিতে হয় মুমিনুল হককে। যেখানে খেলে টেস্টে দেশের সবচেয়ে সফল একজন ব্যাটসম্যান হয়ে উঠেছেন তিনি। গতকাল দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং অর্ডারে আরও একধাপ অবনমন হলো মুমিনুলের। ওপেনিংয়ে সাদমানের সঙ্গী ছিলেন লিটন। মূলত ডানহাতি বাঁহাতি সমন্বয় করতেই এই পরিবর্তন। লিটন ৯ রানে উইকেট হারালে সবাইকে চমকে দিয়ে তিন নম্বরে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের আবির্ভাব। আট নম্বর থেকে তিনে নেমে নিজেকে হয়তো মানিয়ে নিতে পারছিলেন না ময়মনসিংহের এ ক্রিকেটার। খেয়ালি শট খেলে প্রতিপক্ষকে উইকেটটি উপহার দেন ১২ রানে। ডানহাতি বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের সমন্বয় করতে গিয়ে মুশফিকুর রহিম নামেন চার নম্বরে। উইকেটরক্ষক এ ব্যাটসম্যানও ফেল করায় আর সনাতনী তত্ত্বে থাকেনি টিম ম্যানেজমেন্ট। পাঁচ নম্বরে পাঠানো হয় মুমিনুলকে। আফগান লেগ স্পিনের কাছে তিনিও হার মানেন। সাকিব ক্রিজে এসে যখন বোলারদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গেলেন তখনই হার মানেন সাদমান। ১১৪ বল খেলে ৪১ রান করা এ ওপেনার যথেষ্ট লড়াইয়ের মানসিকতা দেখান ড্রেসিংরুমে ফেরার আগে। মাহমুদুল্লাহ ৭ রানে রশিদকে উইকেট দেওয়ার পর সাকিবের সঙ্গে ছিলেন সৌম্য সরকার। আজ এই জুটি অলৌকিক কিছু করে দেখাতে পারলে ম্যাচটি বেঁচে যাওয়ার ক্ষীণ আশা দেখা যেতে পারে। আর বাঁচাতে পারে বৃষ্টি। পরেরটাই বরং নিরাপদ ও বিশ্বস্ত।