বৃষ্টি হলে বাঁচা নয়তো...

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আলী সেকান্দার, চট্টগ্রাম থেকে

আশা ও নিরাশা- এই দুই সহোদর হাত ধরাধরি করে বসে আছে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। আশা নিয়ে এসেছে বৃষ্টির পূর্বাভাস। আর নিরাশার হাতে স্কোর বোর্ডে জমে থাকা আফগানিস্তানের বিশাল লিড। দেশ-বিদেশের আবহাওয়া বিভাগ থেকে আশার বার্তা এসেছে, চট্টগ্রামে নিম্নচাপ দেখা দিয়েছে, টানা বৃষ্টির কারণে টেস্টের বাকি দু'দিন খেলা হওয়ার সম্ভাবনা নাকি নেই। এর নমুনা গতকাল বিকেলে একটু দেখাও গেল। যে কারণে নির্ধারিত সময়ের ২০ মিনিট আগে দিনের খেলা বন্ধ ঘোষণা করলেন আম্পায়াররা। সেখানে আফগানিস্তানের পক্ষ নেওয়া নিরাশা

জানান দিচ্ছে, আগামী দু'দিন খেলা হলে চট্টগ্রাম টেস্ট বাংলাদেশের হারের সম্ভাবনাই বেশি। তৃতীয় দিন শেষে স্কোর বোর্ডে ৩৭৪ রানের লিড জমা আছে আফগানিস্তানের। আজ বাকি দুই উইকেটে আর ক'টা রান যোগ করতে পারলে লিডটা চারশ'র কাছাকাছি চলে যাবে। চতুর্থ দিনের পিচে আফগানিস্তানের বোলিং ইউনিটকে মোকাবেলা করে চতুর্থ ইনিংসে ওই রান তাড়া করে ম্যাচ জেতা স্বাগতিকদের জন্য প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতা জেনেবুঝেও মেহেদী হাসান মিরাজ বলছেন, তারা আশা ছাড়ছেন না। বৃষ্টির বন্ধু আশা নয়, মিরাজ খেলে জয়ের আশা করেন। তিনি বিশ্বাসও করেন, ব্যাটসম্যানরা চেষ্টা করবেন সামর্থ্যের শেষবিন্দু দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে। ১১ জনের সম্মিলিত চেষ্টায় অলৌকিক চিন্তা বাস্তব ও লৌকিক হতে পারেও বলে ধারণা তার।

গত তিন দিন দলের প্রতিনিধি হয়ে এসে তাইজুল, সাকিব ও মিরাজ কেবল স্বপ্ন দেখিয়ে গেলেন।

কখনও কখনও সামর্থ্যের কথাও বোঝাতে চেষ্টা করলেন। প্রত্যাশিত উইকেট না পাওয়ায় কিউরেটরদেরও একহাত নেন সাকিব। বাস্তবতা হলো, সংবাদ সম্মেলনে আশার গল্প শোনানো এই ক্রিকেটারদের কেউই মুখের হতাশা লুকাতে পারেননি। তাদের মুখচ্ছবিতে আঁকা ছিল অবিশ্বাস্য আফগানিস্তানের ব্যাটিং ও বোলিং পারফরম্যান্স। যা বিশ্নেষণ করলে পাওয়া যায়- স্বাগতিক খেলোয়াড়রা কল্পনাও করতে পারেননি, টেস্ট ক্রিকেটের অনভিজ্ঞ আফগান খেলোয়াড়রা টেস্টের সুনিপুণ স্কিল দেখাবে ব্যাটিং ও বোলিংয়ে। চট্টগ্রামের মতো ভেন্যুতে তাদেরই হারের শঙ্কায় ফেলে দেবে তিন দিনে। নির্মম বাস্তবতার জমিনে পা রেখে টাইগাররা এখন উপলব্ধি করতে পারছে, প্রকৃতি না বাঁচালে একমাত্র টেস্টে হয়তো হেরেই যাবে তারা।

গতকাল বাংলাদেশেকে ২০৫ রানে অলআউট করে প্রথম ইনিংসে ১৩৭ রানের লিড পায় আফগানরা। এই লিড ভীষণ আত্মবিশ্বাসী করে তোলে সফরকারী ব্যাটসম্যানদের। যে কারণে কোনোভাবেই তাদের চাপে ফেলতে পারেননি স্বাগতিক বোলাররা। সাকিব ও নাঈম মিলে ২৮ রানে তিন উইকেট তুলে নেওয়ার পরও পথ হারায়নি সফরকারীরা। ইব্রাহিম জাদরান ও আসগর আফগান মিলে ১০৮ রানের জুটি গড়লে আফগান শিবির থেকে শরতের মেঘের ভেলায় চেপে সব চাপ উড়ে গেছে কোনো দূর দেশে। আসগর ৫০ রানে আউট হলেও ইব্রাহিম টেস্ট ক্রিকেটের মেজাজটা ধরে রেখে হতাশা উপহার দিয়ে গেছেন স্বাগতিক স্পিনারদের। দুই মাস আগে 'এ' দলের হয়ে এই জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামেই চার দিনের ম্যাচে ৯৬ রান করা ডানহাতি এ ওপেনার ৮৭ রান করেন ২০৮ বল খেলে। ইব্রাহিম প্রথম ইনিংসে রান না পেলেও অভিজ্ঞ আসগর ৯২ রান করে দলের সংগ্রহ ৩৪২ রানে নিয়ে যেতে দারুণ ভূমিকা রাখেন।

এই দুই সেট ব্যাটসম্যান বিদায়ের পর স্বাগতিক বোলাররা কিছুটা হলেও ম্যাচে ফিরতে পেরেছেন। যে কারণে শেষ বেলার হালকা বৃষ্টিতে দিনের খেলা শেষ ঘোষণার আগে দ্বিতীয় ইনিংসে ৮ উইকেটে ২৩৭ রান যোগ করতে পেরেছে আফগানিস্তান। দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান আফসার খান ৩৪ ও শূন্য রানে থাকা মোহাম্মদ ইয়ামিন আজ নতুনভাবে শুরু করবেন। প্রতিপক্ষের আট উইকেট তুলে নিতে সাকিব তিন, তাইজুল ও নাঈম দুটি করে উইকেট শিকার করেন। ভাগ্য ভালো তাইজুল রশিদ খানকে দ্রুত বোল্ড আউট করেছেন, না হলে যে রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিলেন, তাতে চুরচুর হতে পারতেন বোলাররা। আফগান অধিনায়ক ২২ বলে করেন ২৪ রান, যার বিশই এসেছে নাঈমের এক ওভার থেকে পাঁচটি চারের মারে।

গতকাল আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে সুন্দর ছিল ব্যাটসম্যানদের নিবেদন ও ধৈর্য। মারার বলে শট খেলেছেন, আর ছাড়ার বল ছেড়ে দিয়েছেন প্রায় সব ব্যাটসম্যানই। স্পিন বলে দারুণ ডিফেন্স করে গেছেন ওভারের বেশিরভাগ বল। লুজ বল পেলেই বড় শট খেলে চার-ছয় মেরেছেন। কখনও কখনও ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে প্যাড দিয়ে বল ডিফেন্স করতেও দেখা গেছে। অথচ ১৯ বছর টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বাংলাদেশ দলের ব্যাটসম্যানদের কেউই আসগর, ইব্রাহিম বা রহমত শাহর মতো টেস্টের পরিশীলিত ব্যাটিং দেখাতে পারেননি। তবে যে শটগুলো আসগররা জোরের সঙ্গে খেলেছেন, তার সব বলই হয় গ্যালারিতে, নয়তো গ্যালারির কাছে গিয়ে পড়েছে। এরকম আত্মবিশ্বাস দেখাতে না পারায় বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে টেনেটুনে ২০৫ রান করে। দ্বিতীয় দিন ৮ উইকেটে ১৯৪ রানে ছিল স্বাগতিক দলের। গতকাল তৃতীয় দিন শেষ দুই জুটির কাছে ৭০ থেকে ৮০ রান আশা করেছিলেন সাকিব। কিন্তু তারা ১৭ মিনিট খেলে ২৩ বল মোকাবেলা করে অধিনায়ককে ১১ রানের জোগান দিতে পেরেছেন। সে যা-ই হোক, গতকাল যে ২০ মিনিট কম খেলা হয়েছে, আজ তা পুষিয়ে নিতে ২০ মিনিট আগে খেলা শুরু হবে।