যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জয়শংকর

আসামের নাগরিক তালিকা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়

তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শংকর ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেছেন, আসাম রাজ্যের নাগরিক তালিকা (এনআরসি) কার্যক্রম ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে মন্তব্যের কিছু নেই। গতকাল মঙ্গলবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

জয়শংকর আরও বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ব্যাপারে ভারত পূর্ব প্রতিশ্রুতিতে অনড় রয়েছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে পারস্পরিক সমঝোতা এবং উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে নতুন ফর্মুলা খুঁজতে ঐকমত্য হয়েছে বলে তিনি জানান। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমারের জন্যও ঝুঁকির কারণ হবে।

এর আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সকাল ১১টা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন দু'দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাশ, ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এবং দু'দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জয়শংকর বলেছেন, এবারের বাংলাদেশ সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী অক্টোবরে ভারত সফর-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ অংশীদারিত্বের সম্পর্ক আরও জোরদার করা।

এদিকে বৈঠকের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন জানান, বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি, সীমান্তে হত্যা বন্ধ, ভারতীয় ঋণের টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কেনাকাটা, নতুন গ্যাস গ্রিড স্থাপন, স্কাই মার্শাল প্রসঙ্গ, বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য ভারতে রফতানিতে বাধা দূর করা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিষয় এবং প্রধানমন্ত্রীর আগামী দিল্লি সফরে যেসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে আসামে জাতীয় নিবন্ধন এবং কাশ্মীর প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে তিনি জানান।

রোহিঙ্গা সংকট এবং কাশ্মীরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি-না জানতে চাইলে জয়শংকর বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই একমত যে, রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসন হতে হবে। এ সংকটের দ্রুত সমাধান জরুরি। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ভারত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য ২৫০টি বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, বৈঠকে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফিরে নিজের কার্যালয়ে বৈঠকের ব্যাপারে বিস্তারিত জানান সাংবাদিকদের।

ড. মোমেন বলেন, বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনও সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। সীমান্তে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বন্ধের জন্য ভারত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

বৈঠকে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে আলোচনার ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বৈঠকে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে দ্রুতই পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে দু'পক্ষই একমত হয়েছে। ফেনীর মুহুরী নদীসহ যে নদীর সীমানা নির্ধারণ নিয়ে কিছুটা জটিলতা আছে, তাও নিরসনে দু'পক্ষ একমত হয়। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরে ভারত দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান। ৫৪ নদীর পানি বণ্টনে নতুন ফর্মুলা সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা নতুন ফর্মুলা নয়, বরং নদী অববাহিকার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কল্যাণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে উভয় দেশের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে পানি বণ্টনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এর বাইরে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিষয়ে এখনও যেসব ছোটখাটো আপত্তির বিষয় আছে, তা দ্রুত নিরসনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এ ব্যাপারে সমঝোতার মাধ্যমে উভয় পক্ষই অভিযোগ প্রত্যাহারেও সম্মত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈঠকে আলোচনার ব্যাপারে ড. মোমেন জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারত একমত হয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাবাসন দরকার। এরই মধ্যে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রত্যাবাসন খুব দ্রুতই শুরু হতে পারে, এ বিষয়টিকেও বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ২২ আগস্ট থেকেই শুরু হচ্ছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মিয়ানমার জানিয়েছে তারাও প্রস্তুত।